<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
সর্বমোট জীবনী 325 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 17 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 11 )
পারফর্মিং আর্ট ( 14 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 156 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 1 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 1 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
Untitled Document
এ মাসে জন্মদিন যাঁদের
লীলা নাগ: অক্টোবর ০২
জোহরা বেগম কাজী: অক্টোবর ১৫
ইলা মিত্র: অক্টোবর ১৮
সফিউদ্দিন আহমদ: অক্টোবর ১৯
সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী: অক্টোবর ২২
শামসুর রাহমান : অক্টোবর ২৩
রশীদ তালুকদার: অক্টোবর ২৪
মতিউর রহমান: অক্টোবর ২৯
নেত্রকোণার গুণীজন
ট্রাস্টি বোর্ড
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
New Prof
আব্দুল জব্বার মামুনুর রশীদ জামেলা খাতুন
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
রফিকুন নবী
 
 
trans
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝিতে স্কুলপড়ুয়া এক বালক হাতে পেল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত মাসিক রম্য-ম্যাগাজিন 'ম্যাড'। ম্যাগাজিনের কার্টুনগুলি বালকের নজর কাড়ে। একই সময়ে কিছু ভারতীয় পত্রিকার চিত্রাঙ্কন দেখেও সে মুগ্ধ হয়। মাসিক ম্যাগাজিন আর পত্রিকা-এই দুয়ের মাধ্যমেই কার্টুনের সাথে প্রথম পরিচয় হয় তাঁর। সেগুলি সম্পর্কে জানার আগ্রহটা বেড়ে চলল দিনে দিনে। শুরু হল সেগুলি সংগ্রহ করা। নিতান্তই শখ মেটাতে সে ভর্তি হল ঢাকার আর্ট কলেজে। এবার শুরু নিজের আঁকা। শখ করে ছবি আঁকতে শুরু করা সেদিনের সেই বালকটিই আজকের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় জীবনের প্রথম কার্টুনটি আঁকেন তিনি। কার্টুনটি ছিল ভিক্ষুকদের উপরে। বিষয় দারিদ্র্য। লক্ষ্য ছিল ভিক্ষুকদের ব্যবহার করে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের অবস্থানটা তুলে ধরা। জীবনের প্রথম আঁকা সে কার্টুনটি কোথাও প্রকাশিত না হলেও আগ্রহ কমেনি এতটুকু।

কার্টুনের প্রতি আগ্রহটা আরও বেশি জোরাল হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে, বিভিন্ন যুব সংগঠন, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়নের কার্টুন পোস্টার আঁকার আহ্বানে। তত্‍কালীন সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে পোস্টার আঁকার অনুরোধ করত তারা। তখন সদ্য পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করেছেন রফিকুন নবী। ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বিশাল আকারের ব্যানারে কার্টুন আঁকেন। গণজমায়েতে ব্যবহৃত হত তাঁর আঁকা এইসব অসংখ্য কার্টুন ব্যানার। কিন্তু সরকারি চাকুরে হওয়ায় ঐসব কার্টুনে নিজের প্রকৃত নাম স্বাক্ষর করা ছিল অসম্ভব। আবার একেবারে আলাদা কোন নামও নিজের কাছেই কেমন অস্বস্তি লাগছিল। তাই সেই পোস্টারগুলিতে নিজের প্রকৃত নামটিকেই সংক্ষিপ্ত করে তিনি লিখলেন 'রনবী'। এই রনবীই পরে তৈরি করেন সর্বাপেক্ষা বেশি আলোচিত ও জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র 'টোকাই'। রনবী পৌঁছে যান সব মানুষের হৃদয়ের কাছে।

চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী অথবা কার্টুনিস্ট রনবী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাই নওয়াবগঞ্জ জেলায়। রফিকুন নবীর মাতুল ও পৈতৃক দুই পরিবারই ছিল সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। গোবরাতলা মহানন্দার তীর ঘেঁষে যে গ্রামটি, সেটিই ছিল তাঁর মাতুলালয়। পৈত্রিক ভিটে ছত্রাজিতপুর, শিবগঞ্জ উপজেলায়। মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন ছোটখাট জমিদার পরিবারের সন্তান। পিতা রশীদুন নবী ও পিতামহ মহিউদ্দীন আহমেদ দু'জনই ছিলেন পুলিশ অফিসার। রফিকুন নবীর পিতা রশীদুন নবীর ইচ্ছে ছিল শিল্পী হবেন। তত্‍কালীন কলকাতা আর্ট স্কুলে পড়ার জন্য রশীদুন নবী তাঁর পিতা মহিউদ্দিন আহমেদের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু পিতা মহিউদ্দীনের অনুমতি মেলেনি। রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর কাছে যান রশীদুন নবী। তাঁর কাছে শেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিতার মত পুলিশের পেশাক গ্রহণ করলেও শিল্পী হওয়ার আগ্রহটা কখনও হারাননি। শখ করে ছবি আঁকতেন তিনি। কথাবার্তা, আচার-আচরণে তাঁর অন্তরলোকের শিল্পীকেই খুঁজে পাওয়া যেত। নিজের অতৃপ্ত মনকে তৃপ্ত করতে ছেলে রফিকুন নবীকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন আর্ট কলেজে। আর অবসরকালীন জীবনে মাটি দিয়ে অনেক প্রতিকৃতিমূলক মডেলিং করেছেন।

পুলিশ অফিসার বাবার বদলির চাকুরির সুবাদে রফিকুন নবীর বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকা দেখার সুযোগটা তিনি পেয়েছেন ছোটবেলা থেকেই। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় থিতু হন বাবা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর। ১৯৫০-এর মাঝামাঝিতে স্কুলে ভর্তি হন তিনি। পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৫৯ সালে সম্পূর্ণ পিতার ইচ্ছায় ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি। এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান এবং পরে আরও কতিপয় খ্যাতিমান দিকপালের সান্নিধ্যে থেকে পড়াশোনা করেন। আর্ট কলেজে প্রথম বর্ষে থাকতে নিজের আঁকা ছবি প্রথম বিক্রি করেন ১৫ টাকায়। স্থানীয় সংবাদপত্রে রেখাচিত্র এঁকে এবং বুক কভার ইলাস্ট্রেশন করে পরিচিতি লাভ করেন দ্বিতীয় বর্ষেই। ১৯৬২ সালে এশিয়া ফাউন্ডেশনের বৃত্তি লাভ করেন তিনি। '৬৪ সালে স্নাতক পাশ করেন। ফল প্রকাশের পরের দিনই প্রথিতযশা শিল্পী ও শিক্ষক অধ্যাপক জয়নুল আবেদিন ছাত্র রফিকুন নবীকে চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠালেন। একান্তে ডেকে নিয়ে আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে বলেন তাঁকে। রফিকুন নবী সে সময়ে ঢাকার প্রথম সারির পত্রিকাগুলিতে নিয়মিত কাজ করতেন। নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন সাপ্তাহিক 'পূর্বদেশ' পত্রিকায় কবি আবদুল গনি হাজারির কলাম 'কাল পেঁচার ডায়েরী'-তে। সব মিলিয়ে মাসিক বেতন ২৭৫ টাকা। আর আর্ট কলেজের শিক্ষকের বেতন তখন ছিল ১০ টাকার একটি বাত্‍সরিক ইনক্রিমেন্টসহ মাসিক ১৮০ টাকা। জয়নুল আবেদিন তাঁর ছাত্রকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, প্রতিষ্ঠান বড় হলে বেতন বাড়বে। পরের দিন আবার তাঁর বাবা রশীদুন নবীকে ডেকেও একই অনুরোধ করলেন জয়নুল আবেদিন। পিতা জানালেন জয়নুল আবেদিনের মত একজন সম্মানীয় ব্যক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের চিন্তা করাও উচিত্‍ হবে না। তবে ছাত্রদের সামাল দেওয়ার বিষয়টি ভেবে কিছুটা ঘাবড়েও গিয়েছিলেন রফিকুন নবী। নিজেকে কখনও শিক্ষক হিসেবে চিন্তাও করেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করেন তিনি। আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়।

১৯৭১ সাল। শুরু হলো যুদ্ধ। রফিকুন নবী প্রথমে ভাবলেন যুদ্ধে যাবেন। কিন্তু গেরিলা বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন, শহরে কয়েকজনের থাকা প্রয়োজন। তাই যুদ্ধে না গিয়ে তিনি রয়ে গেলেন ঢাকায়। ঢাকায় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, কাপড় ও খাদ্য সংগ্রহ করা শুরু করলেন। পুরান ঢাকার নারিন্দায় তাঁর বাসাটিতে চলত গোপন মিটিংগুলি। বাংলাদেশ জন্মের পর নবী আবার মনোনিবেশ করেন শিক্ষকতায়। একইসাথে আঁকার জগতে। বছরখানেক পরে শিক্ষকদের জন্য একটি বৃত্তি এলো গ্রীসে গিয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করার। সকলেই ধরে নিয়েছিলেন বৃত্তিটা এসেছে রফিকুন নবীর জন্যই। যদিও তিনি আবেদনও করেননি। ততোদিনে ১৯৭২-এ সংসার শুরু করেছেন তিনি। সদ্য পিতা হয়েছেন। কিছুতেই চাচ্ছিলেন না বৃত্তিটা গ্রহণ করতে। তবুও পরিবার এবং সহকর্মীদের পরামর্শে রফিকুন নবী পাড়ি জমালেন গ্রীসে। ১৯৭৩ সালে গ্রীক সরকারের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন বৃত্তি নিয়ে তিনি ভর্তি হলেন গ্রীসের এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ। পড়াশোনা করলেন প্রিন্ট মেকিং-এর ওপর। গ্রীসের মানুষ তখন সাইপ্রাসের দখল নিতে তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তিন বছর কাটল হোমার, সক্রেটিস ও সফোক্লিসের দেশ গ্রীসে। ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি। শিক্ষক থেকে ধীরে ধীরে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপকের পদে অধিষ্ঠিত হন। পরে চারুকলা ইন্সটিটিউটের পরিচালক হন। ২০০৮ সালে নিযুক্ত হন নবগঠিত চারুকলা অনুষদের ডীন।

১৯৬৯ সালের গনআন্দোলনে মুখর রাজপথ। তত্‍কালীন সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মিছিলগুলির প্রথম সারিতে থাকত পথের শিশুরা। পরিচয়হীন, অতি দরিদ্র আট-দশ বছরের এই পথ-শিশুরা হরতালে গাড়ির চাকার হাওয়া ছাড়ত, ২১শে ফেব্রুয়ারি এলে ইংরেজি-আরবিতে লেখা সাইনবোর্ড ভাঙত। তাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন রফিকুন নবী। একই সময়ে তাঁর বাসার পাশেই দেখেন আরেকটি শিশু। রনবীর ভাষায়, 'আট-ন বছরের একটা ছেলে বসে থাকত। আমার বাসার ঠিক উল্টোদিকের টিনের বাসাটার এক চিলতে বারান্দায় মনের সুখে গড়াগড়ি দিত সারাদিন। পরনে চেক লুঙ্গি। মোটা পেটটায় কষে বাঁধা। মাথায় ছোট করে ছাঁটা খাড়া খাড়া চুল। ওর মা বিভিন্ন বাসায় কাজ করত। ... টিনের বাড়ির বারান্দাটার পাশেই রাস্তার ধারে কাক আর কুকুরের খাদ্য সম্ভারে ভরা ট্যাপ খাওয়া টিনের একটা ডাস্টবিন ছিল। মাঝে মাঝে ডাস্টবিন ঘেঁটে কিছু কাগজপত্র, ভাঙা কাঁচ বা লোহা লক্কড় খুঁজে পেলে জমা করে রাখত বারান্দার কোণে।' পাড়ার লোকদের তামাশার প্রশ্নগুলিতে নির্ভেজাল, বুদ্ধিদীপ্ত ও মজার উত্তর দিত সে। তখনই রফিকুন নবী প্রথম ভাবেন টোকাইয়ের কথা। মোক্কা নামের ঐ শিশুটিকেই তাঁর কল্পনার টোকাইয়ের মডেল করেন। একদিন হঠাত্‍ করেই হারিয়ে গেল সেই ছেলেটি। কিন্তু তার মুখের একটা ছাপ পড়ে ছিল রনবীর মনে। ঐ মুখটাকেই খুঁজতেন অকারণে। '৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাত্রির হত্যাযজ্ঞের পর ২৭ মার্চ কার্ফু্ উঠলে রনবী দেখেন গুলিস্তানের উল্টোদিকের দেয়ালের অপর পারে টাল দিয়ে রাখা অসংখ্য লাশ। পাশের রেললাইনের বস্তিবাসীদের লাশ। কিন্তু তাদের মধ্যে শিশুরাই যে বেশি! দু'বছর আগের সেই ছেলেটি আবার উঁকি দিল মনের কোণে। এরপর '৭৬-এ বিদেশ থেকে ফিরে আবাস গেড়েছেন নতুন পাড়ায়। একদিন বিকেলে বাসার সামনের মাঠে ছেঁড়া একটা বস্তা ঘাড়ে আট-ন' বছরের একটা ছেলের দেখা মিলল। চমকে ওঠেন রনবী! যেন ৭ বছর আগের সেই পেটমোটা ছেলেটিই আবার ফিরে এসেছে। সেদিনই ওকে কিছু আস্কারা দিলেন তিনি। ফলে প্রায় প্রতিদিনই আসা-যাওয়া করতে লাগল সে। তাকে দেখলেই যেচে কথা বলতেন রনবী। আর নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে মজার মজার কথা বলত ছেলেটি। তখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো '৬৯এর সেই ভাবনার। এবার নাম ঠিক করার পালা। এমন একটি নাম যা সামগ্রিকভাবে সব পথশিশুকেই নির্দেশ করবে। মোক্কা, টোকা মিয়া, এরপর টোকন, টোকাইন্যা। কিন্তু সবগুলি নামই কেমন অসম্পূর্ণ মনে হয় রনবীর কাছে। অবশেষে টোকাই। প্রথম ভাবনার দীর্ঘ ৮ বছর পর রনবীর আঁকার জগতে জন্ম নিল নতুন এক অধ্যায়- 'টোকাই'। '৭৮-এ শুরু করা কার্টুনে রনবী টোকাইয়ের বয়স রেখেছেন আট। শিল্পীর কল্পনায় '৭১-এ বেঁচে যাওয়া পিতৃমাতৃ পরিচয়হীন পথের শিশুই 'টোকাই'।

'টোকাই' শিরোনামে প্রথম স্ট্রিপ কার্টুনটি ছাপা হয় বিচিত্রার প্রারম্ভিক সংখ্যায় ১৯৭৮ সালের ১৭ মে। প্রথম কার্টুনে টোকাই একজন বড় কর্মকর্তা। বসে আছে তার বানানো অফিসে। রাস্তার ইট দিয়ে তৈরি একটি টেবিলে। প্রথম কার্টুনেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেল টোকাই। নিয়মিত বিচিত্রায় ছাপা হল টোকাই। বিচিত্রা বন্ধ হলে ২০০০ সাল থেকে সাপ্তাহিক ২০০০-এ আবার শুরু করেন টোকাই। বছর চারেক পরে নিয়মিত টোকাই আঁকায় যতি টানেন রনবী। রনবীর আঁকা টোকাইয়ের মাথায় টাক, কখনও গুটিকতেক চুল, খাটো চেক লুঙ্গি মোটা পেটে বাঁধা। কখনো কাঁধে বস্তা। '৭৮-'৭৯-এ ভোটের সময় বিলি করা জামা পরেছিল টোকাই, সেই জামাটি ছিল ওর থেকে অনেক বড় আকারের। টোকাই থাকে রাস্তার ডাস্টবিনের পাশে, ফুটপাতে, ফেলে রাখা কংক্রিটের পাইপের ভেতর, পার্কের বেঞ্চিতে, ভাঙা দেয়ালের পাশে, কাঠের গুঁড়িতে, ঠেলা গাড়ির ওপরে, ইটের ওপর মাথা পেতে। তার পাশে থাকে কুকুর, কাক। টোকাই কথা বলে কাক, গরু, ছাগল, মশার সাথে। কথা বলে মানুষের সাথেও। তার কথা বুদ্ধিদীপ্ত, বিচক্ষণতায় ভরা, আবার রসে সিক্ত। পেন অ্যান্ড ইঙ্কের পরে রনবীর টোকাই হাজির হল জলরঙের উচ্ছলতায়। সেখানে সে কখনও মনের আনন্দে মার্বেল গুটি দিয়ে খেলে, নৌকা চালায়, বাঁশি বাজায়, বেহালা বাজায়, কখনও রাস্তার বুকে উবু হয়ে লিখতে শুরু করে, কখনও আনন্দে দেয় ছুট। কখনও একা বসে থাকে, আবার কখনও পাঁচিলের উপরে উঠে পাশের দেয়ালের অপর দিকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে, রাজকীয় বাড়ির দরজায় হাজির হয় কাঁধে বস্তা নিয়ে। রনবীর টোকাই এভাবে সমাজ-সংসারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলে প্রতিনিয়ত।

এথেন্সে পড়াশোনা করার দ্বিতীয় বছরের মাথায় বই ইলাস্ট্রেশনের কাজ করে পর্যাপ্ত অর্থ সঞ্চয় করেন রফিকুন নবী। সেই অর্থ দিয়ে ভ্রমণ করেন ইউরোপের অনেক দেশ। রোম, ফ্লোরেন্স, প্যারিস, লণ্ডন, কায়রো গিয়ে বিখ্যাত শিল্পীদের প্রকৃত কাজগুলি নিজের চোখে দেখেন। দেশেও চষে বেড়িয়েছেন এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। নিসর্গকে প্রত্যক্ষ করেছেন নিবিড়ভাবে। দেশ বিদেশের এইসব অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে মনোনিবেশ করেন ছবি আঁকার জগতে। ছবি আঁকার ক্ষেত্রে বিষয়-বৈচিত্র্যের এক দীর্ঘ পথে বিচরণ করেছেন শিল্পী। অনেকদিন মজেছিলেন ছাপাই ছবির জগত নিয়ে। কাঠের বুক চিরে ভেতরের মনোহর টেক্সচারে আঁচড় কাটলেন, কাঠে সৃষ্টি করলেন কবিতার ব্যঞ্জনা। ছাপাই ছবির জগত ছেড়ে দীর্ঘ একযুগ পরে নতুন সৃষ্টির মানসে বাসা বাঁধলেন অন্য জগতে। ঋতুর বৈচিত্র্যে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির অস্পৃশ্য সৌন্দর্যকে পটে ধরবার জন্য নিসর্গের মায়ায় হারালেন শিল্পী রফিকুন নবী। হাতে নিলেন জলরঙের তুলি। শুকনো আবহাওয়ায় আউটডোরে রঙের ওয়াশ দিলে সাথে সাথে শুকিয়ে যায়। সেখানে তিনি রচনা করেন নিজস্ব স্টাইল। আবার ভেজা আবহাওয়ায় দাঁড় করান আরেক আলাদা আমেজ। রঙের সঠিক পরিমাণ ব্যবহারে ছবিতে ফ্রেশনেস বজায় রাখা তাঁর আরেক বৈশিষ্ট্য। জলরঙে তাঁর অন্ধকারের চিত্রায়ণও একই কথা জানান দেয়। বিষয় বাছাই, রং ব্যবহার, আলোর বিন্যাস, একটা বিশেষ আলোকে বিশেষ স্থানে ব্যবহার ইত্যাদির সমন্বয়ে তিনি ছবিতে জন্ম দেন নাটকীয়তার। জলরঙকেই সবচেয়ে ভাল মাধ্যম মনে করেন শিল্পী। ছাত্র জীবনে শুধু সমুদ্র নিয়ে বহু কাজ করেছেন জলরঙে। সকালের সমুদ্র, দুপুরের সমুদ্র, বিকেলের সমুদ্র - সবই আলাদা রং নিয়ে ধরা দিয়েছে শিল্পীর চোখে, আর তাঁর আঁকা ছবিতে। কাজ করেছেন কক্সবাজার, টেকনাফের সমুদ্রে, ঢাকায়, রাজশাহীতে, চাঁপাই নওয়াবগঞ্জের সাঁওতাল এলাকায়। বুড়িগঙ্গার ওপারে, জুরাইন এলাকায় বেশির ভাগ ছবি এঁকেছেন। ড্রাই কাজ করেছেন পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের চরে। এঁকেছেন পদ্মার সাদা চর, তারই পাশে পানি চক চক করছে, তারমধ্যে কালো কালো নৌকা, হঠাত্‍ কোথাও মাঝির লাল গামছাটা ওড়ানো; আবার এঁকেছেন বালু ওড়ানো এক ধরনের ধোঁয়া ধোঁয়া ভাব। জলরং ছাড়াও অন্য সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন রফিকুন নবী। প্রকৃতি, মানুষের পাশাপাশি এঁকেছেন পশু-পাখি। এঁকেছেন উৎক্ষিপ্ত ডানার পাখি, পাতার আড়ালের নিশ্চুপ পাখি, মোরগ, মোষ, হৃষ্ট ষাঁড়, একতারা হাতে ব্যাকুল বাউল, বানরওয়ালা, শিলাইদহের নদীতীরে অভিভূত রবীন্দ্রনাথ। সবখানেই রেখেছেন দক্ষতার স্বাক্ষর। দক্ষতা দেখিয়েছেন লেখার জগতেও। লেখালেখির শুরু সেই স্কুলজীবন থেকেই। তাঁর প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয় '৫৭-'৫৮ সালের মাঝামাঝিতে ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে। পত্রিকায় কলাম লিখতেন নিয়মিত, এখনো লেখেন মাঝে মাঝে। শিশুদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। পরে লিখেছেন আরো ৫টি। বছর দুয়েক সাপ্তাহিক বিচিত্রায় টিভি রিভিউ লিখতেন অর্থাভাবে।

কলেজ জীবন থেকেই রফিকুন নবীর আঁকা ছবি স্থান করে নেয় বিভিন্ন প্রদর্শনীতে। ১৯৬০ থেকে '৬৪ পর্যন্ত ঢাকার কলেজ অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফ্ট-এর বার্ষিক প্রদর্শনীতে, '৭৬-এ এথেন্সে। টোকাইয়ের ২৫ বছর পূর্তিতে গ্যালারী চিত্রকে একক প্রদর্শনী হয় ২০০৪ সালে। ২০০০-এ চারুকলা ইন্সটিটিউটের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অংশগ্রহণ করেন জয়নুল গ্যালারির যৌথ প্রদর্শনীতে। দেশের বাইরে ভারত, গ্রীস, যুগোস্লাভিয়া, জার্মানি, মালয়েশিয়া, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, রুমানিয়া, ইরান, চীন, জাপান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েনা, বুলগেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত সব জাতীয় প্রদর্শনী ও সব দ্বিবার্ষিক এশিয়ান প্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। দেশের জাতীয় আর্ট গ্যালারী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গভবন, সংসদ ভবন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সংগ্রহশালা ইত্যাদি স্থানে তাঁর চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। এছাড়া জর্ডানের রয়্যাল মিউজিয়ামে, গ্রীসের এথেন্সে, যুগোস্লাভিয়া এবং জাপানেও রয়েছে তাঁর চিত্রকর্মের সংগ্রহ।

'৯০ এর দশকে সেই সময়ের বাংলাদেশের সামরিক রাষ্ট্রপতি রনবীর টোকাইদের নিয়ে কয়েকটি স্কুল চালু করেন। স্কুলের নাম দেন 'পথকলি'-র। টোকাই শব্দটিতে অবজ্ঞার প্রকাশ আবিষ্কার করে রাষ্ট্রপতি ১৯৯০ সালে রনবীকে টোকাই নামের পরিবর্তে 'পথকলি' ব্যবহারের কথা ভেবে দেখতে বলেন। রনবী সেদিন কোন উত্তর দেননি। কিন্তু সামরিক জান্তার এই কথা শুনে জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। এরপর 'টোকাই' বাংলা অভিধানে স্থান করে নিয়েছে নতুন শব্দ হিসেবে। অধুনালুপ্ত 'বিচিত্রা'য় টোকাই একবার 'ম্যান অব দ্য ইয়ার' নির্বাচিত হয়। ১৯৯৬ সালে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত শিশুশ্রম বিরোধী আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে অন্যতম বিচারক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন রনবী।

রফিকুন নবী লাভ করেন একুশে পদক, চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, বুক-কভার ডিজাইনের জন্য ১৩ বার ন্যাশনাল একাডেমী পুরস্কার। ২০০৮-এর ৯ আগস্ট চীনের বেইজিংয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় অলিম্পিক চারুকলা প্রদর্শনীর। এখানে রফিকুন নবী একই বছরে আঁকা তাঁর 'খরা' শীর্ষক ছবির জন্য ৮০টি দেশের ৩০০ জন চিত্রশিল্পীর একজন হিসাবে 'এক্সিলেন্ট আর্টিস্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড' মনোনীত হন।

গম্ভীর চেহারার রফিকুন নবীর মাঝে সৃষ্টিশীলতার সাথে খেলে যায় রসবোধ। নিসর্গের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে রং-তুলি হাতে তার প্রেমে নিজেকে হারাতে ভালবাসেন শিল্পী। আবার সমাজ ও রাজনীতি সচেতন রনবী ভাবেন সাধারণ মানুষের কথা, পথ-শিশুদের দুঃখ-দুর্দশাকে দেখেন বড় করে। কোন নিপীড়ন সহ্য করবেন না-এই তাঁর প্রতিজ্ঞা। শিল্পীর শিল্প-পরিমণ্ডল জুড়ে তাই স্থান করে নিয়েছে বাস্তব আর কল্পনার সম্মিলন। এক সত্তা যখন সুন্দরের পূজা করতে ব্যস্ত, অন্য সত্তা তখন সমাজ-বাস্তবতার অসঙ্গতিগুলোকে বিদ্রুপ করে কঠোরভাবে। শত ব্যস্ততার জীবনে আঁকার জগতটিই শিল্পীর সবচেয়ে বেশি প্রিয়। নিসর্গ-প্রেম আর টোকাই - এই দুই জগতকে নিয়েই রফিকুন নবী লালন করে চলেছেন সময়ের পথে তাঁর সাহসী যাত্রা।

জীবনী সংক্ষেপ

পূর্ণনাম: মোঃ রফিকুন নবী
জন্ম: ২৮ নভেম্বর, ১৯৪৩
জন্মস্থান: চাঁপাই নওয়াবগঞ্জ
পৈতৃক নিবাস: ছত্রাজিতপুর, শিবগঞ্জ
বাবা: রশীদুন নবী
মা: আনোয়ারা বেগম
স্ত্রী: নাজমা বেগম
পুত্র-কন্যা: দুই ছেলে, এক মেয়ে।

পেশা: শিক্ষক, কার্টুনিস্ট, পেইন্টার, খ্যাতনামা ইলাস্ট্রেটর, প্রচ্ছদ ডিজাইনার।

প্রকাশনা: ৩ টি উপন্যাস, ৫ খণ্ডে টোকাই, ১ টি শিশুতোষ উপন্যাস, ১ টি প্রবন্ধ সংগ্রহ।

আন্তর্জাতিক সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ:
অংশগ্রহণ করেন ১৯৮৭ সনে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ইউনিসেফ কর্তৃক আয়োজিত চাইল্ড সারভাইভাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক সেমিনারে, ১৯৯৭ সনে তুর্কির ইসতান্বুলে অনুষ্ঠিত ফোক আর্ট-সংক্রান্ত সেমিনার ও সংস্কৃতিবিষয়ক অনুষ্ঠানে, ১৯৯৪ সনে ভারতে বাংলাদেশ কালচারাল ফেস্টিভালে এবং ১৯৯৬ সনে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত শিশুশ্রম বিরোধী আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে অন্যতম বিচারক হিসেবে।

পুরস্কার:
একুশে পদক-১৯৯৩, চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমি অ্যাওয়্যার্ড-১৯৮৯, শিশুদের বই ডিজাইনের জন্য অগ্রণী ব্যাংক অ্যাওয়্যার্ড-১৯৯২, ১৯৯৫; ১৯৬৮ থেকে ১৩ বার ন্যাশনাল বুক সেন্টার পুরস্কার লাভ, অলিম্পিক চারুকলা প্রদর্শনী-২০০৮এ ৩০০ জন 'এক্সিলেন্ট আর্টিস্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড'-এর মধ্যে একজন হিসাবে মনোনীত।

লেখক : মোঃ কুতুব উদ্দিন সজিব

Share on Facebook
Gunijan

© 2017 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .