<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
 
সর্বমোট জীবনী 320 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 17 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 10 )
পারফর্মিং আর্ট ( 12 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 155 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 1 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 0 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
ট্রাস্টি বোর্ড ( 12 )
( 0 )
Hacked By leol_3t ( 0 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
শামসুর রাহমান
 
 
trans
শৈশবে তাঁর দেখা প্রথম চিত্রশিল্পী বাবুবাজারের নঈম মিঞা। ছেলেবেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে নঈম মিঞার দোকানের সামনে দাঁড়াতেন তিনি। তুলি দিয়ে কাঁচের ওপর ছবি আঁকতেন নঈম মিঞা। সেগুলো বিক্রি করতেন। নঈম মিঞার কাছে ছবি আঁকার পাঠ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু একদিন নঈম মিঞা ছোট বালকটিকে ধমক দিয়ে বিদায় করে দিলেন। কারণ তাঁর জীবনের প্রথম শিল্পের ওস্তাদ নঈম মিঞা চাননি শিল্পের নেশায় এই শিশুর জীবনও তার মতো খুকখুক কাশির ও ধুকধুকে কষ্টের হয়ে উঠুক। নঈম মিঞার মতো পরবর্তী জীবনে তাঁর বাবাও চাননি তাঁর ছেলে কবি হোক। কবিতা লিখলে জীবনে বিত্তবৈভবে সফল হওয়া যায় না, তাই অভিভাবকরা কেউ কবি হতে তাঁকে উৎসাহিত করেননি।

কিন্তু নঈম মিঞা এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে উৎসাহ না পাওয়ায় তাঁর সৃষ্টিশীল মন থেমে থাকেনি। সকল বাধাকে অতিক্রম করে তিনি হয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম কবি। আর বাংলাদেশের অন্যতম এই কবি হচ্ছেন শামসুর রাহমান। শুধু অন্যতমই নন, বরং তিনি এদেশের অনন্য, প্রধান কবি।

১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর বুধবার সকালে ঢাকা শহরের মাহুতটুলির এক সরু গলির ভিতর নানার কোঠাবাড়িতে শামসুর রাহমানের জন্ম। তাঁর ডাক নাম বাচ্চু। শামসুর রাহমানের বাবা মোখলেসুর রাহমান চৌধুরীর প্রথম পক্ষের স্ত্রী তিন পুত্র রেখে মারা যান। এর পর প্রথম স্ত্রীর ছোটবোন আমেনা বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। আমেনা বেগমের ১০ সন্তানের মধ্যে শামসুর রাহমান জ্যেষ্ঠ। তাঁরা চার ভাই ও ছয় বোন।

সাহিত্যচর্চার বালাই নেই এমন এক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন তিনি। পরিবারের কারো সঙ্গীত, চিত্রকলা ও সাহিত্য সম্পর্কে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে পুরনো ঢাকার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ কাওয়ালি ও মেরাসিনের গানের সাথে পরিচয় হয়েছিল অতি শৈশবেই। পরিবারের সব লোকজন উপলক্ষ পেলেই কাওয়ালির আয়োজন করত।

তাঁর বড় ভাই খলিলুর রাহমানের স্ত্রী জাহানারা বেগম ছিলেন নবাব বাড়ির মেয়ে। উর্দু সাহিত্যে বিস্তর পড়াশোনা ছিল কবির বড় ভাবির। বড় ভাবি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন বেশকিছু উর্দু গল্প ও কবিতা এবং মির্জা গালিবের গজল। তাঁর বিধবা ফুফুর ছেলে ইয়াকুব আলী খান থাকতেন কবির পরিবারের সাথেই। ইয়াকুব আলীর রূপকথা বলার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। নিজস্ব ভঙ্গি দিয়ে রূপকথাকে আরো রূপময় করে তুলতেন ইয়াকুব আলী। তাঁর পরবর্তী জীবনে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে নিয়ে লেখা প্রতীকী কবিতা 'হাতির শুঁড়'-এ ইয়াকুব আলীর রূপকথার ঋণ আছে।

তাঁর ছেলেবেলায় পুরনো ঢাকার মাহুতটুলিতে দালানকোঠা ও যন্ত্রচালিত গাড়ি ছিল না বললেই চলে। মাটির ঘর, ঘোড়ার গাড়ি, সহিস, বিভিন্ন দোকান, আরমানিটোলা স্কুলের পেছনের শিউলিতলা, জন্মাষ্টমীর উৎসব, মহরমের মিছিল ও তাজিয়া, দেবদেবীর ছবি, কাননবালার ছবি শৈশবে দেখা পুরনো ঢাকার এসব স্মৃতি কবির মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। ঢাকায় তখনও বিদ্যুৎ ছিল না। মহল্লার মোড়ে ও গলিতে সন্ধ্যায় বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যেত বাতিঅলা। শৈশবে দেখা এই বাতিঅলাকে নিয়েই পরিণত বয়সে কবি লিখেছেন 'শৈশবের বাতিঅলা আমাকে' নামের কবিতাটি।

শৈশবে কবি তাঁর শিল্পের ক্ষুধা মিটিয়েছেন সস্তা হিন্দি সিনেমা দেখে। বাবা কিছুদিন সিনেমা হলের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের ডায়মন্ড ও ঢাকা তাজমহল সিনেমা হলের অংশীদার। বৈমাত্রেয় মেজো ভাই আমিনুর রাহমান চৌধুরী ছিলেন তাজমহল সিনেমা হলের অপারেটর। মেজো ভাই আমিনুর রাহমান চৌধুরীর ঘরের মায়া ছিল না। উড়নচণ্ডী সেই ভাই নৌবাহিনীর চাকরি নিয়ে সমুদ্রে ও বিদেশ-বিভূঁইয়ে জীবন কাটিয়ে দেন। রবীন্দ্রনাথের 'চয়নিকা' থেকে 'ভারততীর্থ' কবিতাটি আপনমনেই নিজের মতো আবৃত্তি করতেন কবির মেজো ভাই। আবৃত্তিকারের গভীর আন্তরিকতার কারণে কবির ছোট্ট মনে গেঁথে গিয়েছিল সেই কবিতা।

শামসুর রাহমানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ পোগজ স্কুলে। ১৯৩৬ সালে এ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। এ স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় ছোট বোন নেহারের মৃত্যুতে একটি কবিতা লেখেন তিনি। তাঁর লেখা জীবনের প্রথম এই কবিতা শুনে তাঁর মা কেঁদেছিলেন খুব।

১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর অবসরে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের গল্পগুলো পড়ে ফেলেন শামসুর রাহমান। এ সুবাদে পড়া হয়ে যায় বঙ্কিম চন্দ্র ও শরৎ চন্দ্রের রচনা। তখন তাঁরা থাকতেন ৩০ নং আশেক লেনে এবং ১৭ নং আশেক লেনে থাকতেন শিল্পী হামিদুর রহমানদের পরিবার। একদিন রাস্তা থেকে শামসুর রাহমানকে ডেকে নিয়ে যান হামিদুর রহমান। শামসুর রাহমানের চেহারা দেখে হামিদুর মনে করেছিলেন, তিনি কবিতা লেখেন। ১৭ নং আশেক লেনের বাড়িতে যাওয়া আসার সুবাদে সেইসময়ে ঢাকার প্রথম সারির শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ট পরিচয় ঘটে। হামিদুর রহমানদের বাড়ির আড্ডার সংস্পর্শেই শামসুর রাহমানের মনে সৃষ্টির বাসনা জেগে ওঠে। হঠাৎ এক মেঘলা দিনের দুপুরে তিনি একটি কবিতা লিখে ফেলেন। সেই কবিতা পড়ে শুনালেন হামিদুর রহমানকে। তিনি শামসুর রাহমানকে উৎসাহিত করেছিলেন খুব।

তাঁরই উৎসাহে শামসুর রাহমান নলিনীকিশোর গুহ সম্পাদিত সেকালের বিখ্যাত সাপ্তাহিক 'সোনার বাংলা'-য় (ঢাকা থেকে প্রকাশিত) কবিতা লিখে পাঠান। তখন 'সোনার বাংলা'-য় লিখতেন জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো প্রথিতযশা কবিরা। ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি 'সোনার বাংলা'-য় শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা ছাপা হয়। সেই কবিতার নাম 'তারপর দে ছুট'। ১৯৪৭ সালে আই.এ. পাশ করার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। স্নাতক সম্মান পড়া শেষ বছর পর্যন্ত চালিয়ে গেলেও পরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি। ১৯৫৩ সালে পাস কোর্সে স্নাতক পাশ করেন। মাস্টার্স ভর্তি হয়ে প্রথম পর্ব কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন, কিন্তু শেষ পর্বের পরীক্ষায় আর বসা হয়নি তাঁর। ১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখেই আত্মীয়া জোহরা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির পাঁচ সন্তান (তিন কন্যা ও দুই পুত্র)। তারা হলেন যথাক্রমে সুমায়রা রাহমান, ফাইয়াজুর রাহমান, ফৌজিয়া রাহমান, ওয়াহিদুর রাহমান মতিন এবং সেবা রাহমান।

১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন 'মর্নিং নিউজ'-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে। ১৯৫৮ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন রেডিও পাকিস্তান-এর ঢাকা কেন্দ্রে। পরে আবার ফিরে আসেন ঊর্ধ্বতন সহ-সম্পাদক হিসেবে 'মর্নিং নিউজ' পত্রিকায়। 'মর্নিং নিউজ'-এ ১৯৬০ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে পত্রিকা জগতে নতুন আসা সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলা পত্রিকা 'দৈনিক পাকিস্তান'-এ ('দৈনিক বাংলা') যোগ দেন সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দীর্ঘ ১৩ বছর কাজ করার পর ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি 'দৈনিক বাংলা' এবং এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক 'বিচিত্রা'-র সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসময় 'একটি মোনাজাত' নামের কবিতা লেখার জন্য সরকারের রোষানলে পড়েন।

১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে 'দৈনিক বাংলা'-র প্রধান সম্পাদকের পদে ইস্তফা দেন কবি। এ সিদ্ধান্ত ছিল শামসুর রাহমানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা ঢাকায় থাকার মতো তখনো কোনো নিবাস ছিল না কবির, অর্থ উপার্জনের ছিল না কোনো বিকল্প রাস্তা। তাছাড়া তখন কবির ফুসফুসেও দেখা দিয়েছে সমস্যা। সব মিলিয়ে প্রচণ্ড দুঃসময় কবির ব্যক্তিগত জীবনে। জাতীয় জীবনের দুঃসময়ে নিজের কথা ভুলে কবিতাকে অস্ত্র মেনে দুঃশাসন অবসানের আন্দোলন চালিয়ে গেলেন কবি। ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী চার বছরের প্রথম বছরে 'শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা', দ্বিতীয় বছরে 'স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা', তৃতীয় বছরে 'সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা' এবং চতুর্থ বছরে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা' লেখেন তিনি। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের অবসান ও গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা প্রত্যক্ষ করে ১৯৯১ সালে লেখেন 'গণতন্ত্রের পক্ষে কবিতা'।

সাংবাদিকতার বাইরে তিনি প্রথম সম্পাদনা করেন লিটল ম্যাগাজিন 'কবিকণ্ঠ' । ১৯৫৬ সালে তিনি ছিলেন এটির সম্পাদক মণ্ডলীর সম্পাদক। ১৯৮৭ সালে ক্ষণজীবী 'অধুনা' সাহিত্যপত্রের সম্পাদক ছিলেন তিনি। সাপ্তাহিক 'মূলধারা'-য় ১৯৮৯ সালে প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন তিনি এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত 'মূলধারা'-র সাহিত্য সহযোগী পত্রের সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নিযুক্ত হন।

শামসুর রাহমানের ডাক নাম বাচ্চু। নাম থেকে পৈত্রিক উপাধি 'চৌধুরী' বাদ দিয়েছিলেন তিনি। শামসুর রাহমান সাংবাদিকতার খাতিরে বিভিন্ন সময়ে বেশকিছু ছদ্মনাম গ্রহণ করেছেন। পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে এসব ছন্দনাম নিয়েছেন তিনি। নামগুলো হচ্ছে: সিন্দবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক। একবার মাত্র কবিতার প্রয়োজনে ছদ্মনাম নিয়েছেন তিনি। পাকিস্তান সরকারের আমলে কলকাতার একটি সাহিত্য পত্রিকায় মজলুম আদিব (বিপন্ন লেখক) নামে কবিতা ছাপা হয়। তাঁর সে নামটি দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট সমালোচক আবু সায়ীদ আইয়ুব।

সক্রিয় রাজনীতি থেকে বরাবরই দূরে থাকতে চেয়েছেন শামসুর রাহমান। কিন্তু বারবারই তাঁকে আমূল নাড়িয়ে গেছে বাঙালির শোষণ-পীড়ন ও বঞ্চনার বিভিন্ন বিষয়। রাজনীতির দানব বাঙালির উপর যতবার হামলে পড়েছে ততবার তিনি অস্থির হয়ে উঠেছেন। জনগণের পক্ষে সাড়া দিয়েছেন। তাঁর এ সাড়া এসেছে অধিকাংশ সময়ই কবিতার মাধ্যমে এবং কখনো কখনো আবার সরাসরি।

শৈশবে বাবাকে শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের কৃষকপ্রজা পার্টির সঙ্গে জড়িত থাকতে দেখেছেন। পার্টির হয়ে ফজলুল হকের অনুরোধে ১৯৩৭ সালে রায়পুরা ও পাড়াতলীর জনগণের প্রতি ভালোবাসার টানে নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন তাঁর বাবা। মুসলীম লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী খাজা মোহাম্মদ সেলিমের কাছে হেরে যান তিনি। বাবার অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জনমানুষের প্রতি অপরিসীম দরদ তাঁর চেতনায়ও প্রবাহিত ছিল।
শামসুর রাহমানের বিরুদ্ধে বারবার বিতর্ক তুলেছে কূপমণ্ডুকরা। তারা শুধু বিতর্ক তুলেই থেমে থাকেনি। বর্বরতার চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছে। কবির মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছে। তাঁকে হত্যার জন্য বাসায় হামলা করেছে। এতকিছুর পরও কবি তাঁর বিশ্বাসের জায়াগায় ছিলেন অনড়।

ন্যায়, যুক্তি ও প্রগতির পক্ষের সাহসী যোদ্ধা শামসুর রাহমান তৎকালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে ১৯৫৮ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় লেখেন 'হাতির শুঁড়' নামক কবিতা। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারাগারে তখন তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখেন অসাধারণ কবিতা 'টেলেমেকাস' (১৯৬৬ বা ১৯৬৭ সালে)। গ্রীক পুরানের বীর ইউলিসিসের পুত্র টেলেমেকাস। পিতা দীর্ঘদিন রাজ্য ইথাকায় অনুপস্থিত। পিতার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় পুত্র টেলেমেকাসের আর্তি জড়িত সে কবিতাটি আছে নিরালোকে দিব্যরথ গ্রন্থে।

১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেন। শামসুর রাহমান তখন সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা 'দৈনিক পাকিস্তান'-এ কর্মরত ছিলেন। পেশাগত অনিশ্চয়তার তোয়াক্কা না করে রবীন্দ্র সঙ্গীতের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন 'দৈনিক পাকিস্তান'-এর হাসান হাফিজুর রহমান, আহমেদ হুমায়ুন, ফজল শাহাবুদ্দীন ও শামসুর রাহমান। ১৯৬৮ সালের দিকে পাকিস্তানের সব ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব করেন আইয়ুব খান। আগস্টে ৪১ জন কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। কবিও তাঁদের একজন ছিলেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি লেখেন মর্মস্পর্শী কবিতা 'বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা' । ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে একটি লাঠিতে শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে মানসিকভাবে মারাত্মক আলোড়িত হন শামসুর রাহমান। কর্মস্থলে তাঁর চোখের সামনে ভাসতে থাকে সেই শার্ট, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেও এ দৃশ্য ভোলা সম্ভব হয় না তাঁর পক্ষে। সন্ধ্যায় একটানে লিখে ফেলেন 'আসাদের শার্ট' কবিতাটি।

১৯৭০ সালের ২৮ নভেম্বর ঘূর্ণিদুর্গত দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় ও মৃত্যুতে কাতর কবি লেখেন 'আসুন আমরা আজ ও একজন জেলে' নামক কবিতা । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার নিয়ে চলে যান নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি লেখেন যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় আক্রান্ত ও বেদনামথিত কবিতা 'স্বাধীনতা তুমি' ও 'তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা' ।

শামসুর রাহমানের গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে কলকাতা থেকে কবীর চৌধুরীর অনুবাদে প্রকাশিত হয় 'শামসুর রাহমান: সিলেকটেড পোয়েমস'। কবিতার বাইরেও বিভিন্ন সময়ে তাঁর রচিত শিশুসাহিত্য, অনুবাদ, গল্প, উপন্যাস, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক গদ্য নিয়ে বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বেশকিছু জনপ্রিয় গানের গীতিকারও তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০), রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮), নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বন্দি শিবির থেকে (১৯৭২), ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা (১৯৭৪), আমি অনাহারী (১৯৭৬), শূন্যতায় তুমি শোকসভা (১৯৭৭), বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে (১৯৭৭), প্রেমের কবিতা (১৯৮১), ইকারুসের আকাশ (১৯৮২), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২), বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় (১৯৮৮), হরিণের হাড় (১৯৯৩), তুমিই নিঃশ্বাস, তুমিই হৃদস্পন্দন (১৯৯৬), হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল (১৯৯৭)। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতা ও শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতা।

শিশুতোষ গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: এলাটিং বেলাটিং (১৯৭৫), ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো (১৯৭৭), স্মৃতির শহর (১৯৭৯), লাল ফুলকির ছড়া (১৯৯৫)। অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: মার্কোমিলিয়ানস (১৯৬৭), রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা (১৯৬৮), হৃদয়ে ঋতু, হ্যামলেট, ডেনমার্কের যুবরাজ (১৯৯৫)। সম্পাদিত গ্রন্থ হাসান হাফিজুর রহমানের অপ্রকাশিত কবিতা (বাংলা ১৩৯২), দুই বাংলার ভালবাসার কবিতা (যৌথভাবে) এবং দুই বাংলার বিরহের কবিতা (যৌথভাবে)। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে শামসুর রাহমানের গল্প, শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অক্টোপাস ।

শামসুর রাহমান অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানই তাঁকে সম্মানিত করতে পেরে নিজেরা সম্মানিত বোধ করেছে। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে: আদমজী পুরস্কার (১৯৬৩), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৯), একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯১), সাংবাদিকতায় জাপানের মিত্সুবিশি পদক (১৯৯২), ভারতের আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৪)। এছাড়া ভারতের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট. উপাধি প্রদান করেছে। শামসুর রাহমানকে প্রথম বড় মাপের সংবর্ধনা প্রদান করা হয় ১৯৭৯ সালের ২৪ অক্টোবর। পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে শামসুর রাহমান সংবর্ধনা পরিষদ বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে তাঁকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। কবি ও সাংবাদিক হিসেবে সম্মানিত হয়ে তিনি ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বার্মা (মায়ানমার), জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।

২০০৬ সালের ১৭ আগষ্ট কবি শামসুর রাহমান এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। কিন্তু তিনি তাঁর কবিতা ও অন্যান্য লেখার মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবেন সবসময়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী:

জন্ম: ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর বুধবার সকালে ঢাকা শহরের মাহুতটুলির এক সরু গলির ভিতর নানার কোঠাবাড়িতে শামসুর রাহমানের জন্ম। তাঁর ডাক নাম বাচ্চু।

বাবা-মা: শামসুর রাহমানের বাবা মোখলেসুর রাহমান চৌধুরীর প্রথম পক্ষের স্ত্রী তিন পুত্র রেখে মারা যান। এর পর প্রথম স্ত্রীর ছোটবোন আমেনা বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। আমেনা বেগমের ১০ সন্তানের মধ্যে শামসুর রাহমান জ্যেষ্ঠ।

পড়াশুনা: শামসুর রাহমানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ পোগজ স্কুলে। ১৯৩৬ সালে এ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। ১৯৪৭ সালে আই.এ. পাশ করার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। স্নাতক সম্মান পড়া শেষ বছর পর্যন্ত চালিয়ে গেলেও পরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি। ১৯৫৩ সালে পাস কোর্সে স্নাতক পাশ করেন। মাস্টার্স ভর্তি হয়ে প্রথম পর্ব কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন, কিন্তু শেষ পর্বের পরীক্ষায় আর বসা হয়নি তাঁর।

কর্মজীবন: ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন 'মর্নিং নিউজ'-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে। ১৯৫৮ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন রেডিও পাকিস্তান-এর ঢাকা কেন্দ্রে। পরে আবার ফিরে আসেন ঊর্ধ্বতন সহ-সম্পাদক হিসেবে 'মর্নিং নিউজ' পত্রিকায়। 'মর্নিং নিউজ'-এ ১৯৬০ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে পত্রিকা জগতে নতুন আসা সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলা পত্রিকা 'দৈনিক পাকিস্তান'-এ ('দৈনিক বাংলা') যোগ দেন সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দীর্ঘ ১৩ বছর কাজ করার পর ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি 'দৈনিক বাংলা' এবং এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক 'বিচিত্রা'-র সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসময় একটি 'মোনাজাত' নামের কবিতা লেখার জন্য সরকারের রোষানলে পড়েন তিনি।

সাংবাদিকতার বাইরে তিনি প্রথম সম্পাদনা করেন লিটল ম্যাগাজিন 'কবিকণ্ঠ'। ১৯৫৬ সালে তিনি ছিলেন এটির সম্পাদক মণ্ডলীর সম্পাদক। ১৯৮৭ সালে 'ক্ষণজীবী অধুনা সাহিত্যপত্র'-র সম্পাদক ছিলেন তিনি। সাপ্তাহিক 'মূলধারা'-য় ১৯৮৯ সালে প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন তিনি এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মূলধারার সাহিত্য সহযোগী পত্রের সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নিযুক্ত হন।

পারিবারিক জীবন: ১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখেই আত্মীয়া জোহরা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির পাঁচ সন্তান (তিন কন্যা ও দুই পুত্র)। তারা হলেন যথাক্রমে সুমায়রা রাহমান, ফাইয়াজুর রাহমান, ফৌজিয়া রাহমান, ওয়াহিদুর রাহমান মতিন এবং সেবা রাহমান।

মৃত্যু:২০০৬ সালের ১৭ আগষ্ট কবি শামসুর রাহমান এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।

তথ্যসূত্র:
কালের ধুলোয় লেখা : শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী
স্মৃতির শহর : শামসুর রাহমানের স্মৃতিচারণমূলক শিশুতোষ গ্রন্থ
হুমায়ুন আজাদের গ্রন্থ শামসুর রাহমান/ নিঃসঙ্গ শেরপা
বাংলা একাডেমী লেখক অভিধান : বাংলা একাডেমী

মূল লেখক : ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ
পুনর্লিখন: গুণীজন দল

Share on Facebook
Gunijan

© 2018 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .