<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
 
সর্বমোট জীবনী 317 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 17 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 10 )
পারফর্মিং আর্ট ( 11 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 154 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 0 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 0 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
ট্রাস্টি বোর্ড ( 12 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
আজিজুর রহমান মল্লিক
 
 
trans
শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ আজিজুর রহমান মল্লিক ছিলেন এক বর্ণাঢ্য ও বর্ণিল জীবনের অধিকারী। তিনি তাঁর সময়ের ও পরবর্তীকালের তরুণ প্রজন্মের জন্যও একজন আদর্শ অনুসরণীয় ব্যক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান রিজিওনাল স্টাডিস বিভাগের প্রথম বাঙালি পূর্ণ অধ্যাপক (১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিকে মাত্র ৪১ বৎসর বয়সে তিনি পূর্ণ অধ্যাপক হন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য, বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা সচিব, ভারতে (একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটান) বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত, দেশের প্রথম টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নির্বাচিত চেয়ারম্যান। একজন সাধারণ বাঙালি হিসাবে তিনি এসব কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন নিজের মেধা, ধীশক্তি আর আদর্শ-নিষ্ঠার দ্বারা। এদেশের শিক্ষা-সমাজ-প্রগতির আন্দোলনে আজিজুর রহমান মল্লিক নিত্য প্রশংসনীয় এবং শ্রদ্ধেয়।

আজিজুর রহমান মল্লিকের জন্ম ১৯১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা জেলার ধামরাই থানার রাজাপুর গ্রামে। কিন্তু সার্টিফিকেটে তাঁর জন্ম তারিখ অন্য। সেসময় ১৬ বছর পূর্ণ না হলে কেউ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে পারত না। ফলে তাঁর বাবা কোর্টে গিয়ে এফিডেভিট করিয়ে আজিজুর রহমান মল্লিকের বয়স বাড়িয়ে দেন। ডিসেম্বরের স্থলে করা হল মার্চ মাস। ফলে তাঁর জন্ম তারিখ গিয়ে দাঁড়ায় ১৯১৮ সালের ৩১ মার্চ।

আজিজুর রহমানের বাবা মোহাম্মদ ইসমাইল মল্লিক ছিলেন চাকুরিজীবী। তিনি বার্মায় কাজ করতেন। মা বেগম সাজেদা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। পাঁচ ভাই, এক বোনের মধ্যে আজিজুর রহমান মল্লিক ছিলেন সবার বড়।

মল্লিক পরিবার ছিল প্রভাবশালী ভূস্বামী এবং লাখেরাজ সম্পত্তি ও তালুকের মালিক। কিন্তু একটি সময় এসে আজিজুর রহমান মল্লিকের দাদা মুন্সি বাহরাম মল্লিক অনেক জেলে প্রজার স্বার্থে ও নিজের আত্মসম্মান রক্ষার্থে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন গৌরীপুরের মহারানী স্বর্ণময় দেবীর সঙ্গে মামলায় জড়িয়ে পড়লে এ পরিবারটি দুরাবস্থার সম্মুখীন হয়। মামলাটি চলছিল মূলত ময়মনসিংহ ও ঢাকা কোর্টে। পরে ঢাকায় প্রথম স্থাপিত হাইকোর্টে মামলার আপোষ নিষ্পত্তি হয়। এসময় ইসমাইল হোসেন ঢাকায় পড়াশোনা করতেন। পরিবারের অবস্থা বিবেচনা করে এক সময় তিনি কাস্টমসে চাকুরি নিয়ে বার্মায় চলে যান। ফলে আজিজুর রহমানের ছোটবেলা বার্মায় কাটে।

বাড়িতেই গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি শিক্ষা ও কোরআন পাঠ শিখেছিলেন তিনি। প্রায় একই সঙ্গে বার্মার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে স্ট্যান্ডার্ড ফোর-এ ভর্তি হন। এই স্কুলে তিনি তিন বছর পড়েন। হঠাৎ করেই আজিজুর রহমানের এক চাচা মারা গেলে তাঁদের পরিবার প্রথমে ঢাকায় আসে এবং পরে গ্রামে চলে যায়। বাব-মা বার্মায় ফিরে গেলেও তিনি দেশেই রয়ে যান। মানিকগঞ্জ মডেল হাই স্কুল থেকে ১৯৩৪ সালে লেটারসহ প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা সরকারী কলেজে। ১৯৩৬ সালে এখান থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। পরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ১২৬ নম্বর রুমের আবাসিক ছাত্র ছিলেন তিনি। এসময় হল প্রোভোস্ট ছিলেন ড. মাহমুদ হাসান।

মানিকগঞ্জ মডেল স্কুলে পড়ার সময় সহপাঠী নিরঞ্জন সরকার, বলাই বসাক আর আজিজুর রহমান মল্লিক ছিলেন হরিহর আত্মা। তাঁরাই ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হতেন। নিরঞ্জন ছিলেন বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবী দলের সদস্য। তিনি মাঝে মাঝেই আজিজুর রহমানকে নিয়ে রাতের বেলায় একটি আখড়ায় যেতেন। সেখানে লাঠিখেলা, ছোরা খেলা, পিস্তল চালানো শেখানো হত। সেখান থেকেই আজিজুর রহমান ব্রিটিশ বিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন। তবে এক শিক্ষকের পরামর্শে তিনি সেই গোপন দলের সদস্য হওয়া থেকে বিরত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই আবার শুরু করেন শারীরিক কসরত ও খেলাধুলা। তবে এবার আর কোনো গোপন বিপ্লবী দলের সদস্য হিসেবে নয়। একেবারেই শরীর ঠিক রাখার জন্য। সেসময় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের তেজ থাকলেও ছাত্র রাজনীতি নিয়ে তেমন মাতামাতি ছিল না। দলাদলিও তেমন ছিল না। জেলাভিত্তিক মিলমিশের মাধ্যমে ছাত্ররা ইউনিয়ন নির্বাচন করতেন। ১৯৩৭ সালে আজিজুর রহমান মল্লিক যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তখনই তিনি ছাত্র সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ সালে তিনি অনার্স পাশ করেন আর ১৯৪০ সালে এম.এ.। ১৯৪১ সালেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগাদান করেন। ১৯৪২ সালে তিনি বিয়ে করেন রহমতুন্নেছাকে। তাঁদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে মতের মিল না হওয়ায় তিনি চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে যান রাজশাহী সরকারী কলেজে। সেখান থেকে ১৯৫১ সালে পিএইচডি ডিগ্রী করার জন্য বিলেত চলে যান। মাত্র ১ বছর ৮ মাসে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৫৪ সালে দেশে ফিরে এসে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তখন আইয়ুবের আমল চলছে দেশে। সেসময় ছাত্ররা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। প্রায়ই তাদের বিভিন্নভাবে শেল্টার দেয়া, পুলিশের গ্রেফতার এড়ানো, তাদেরকে ঠিকমত পরিচালনা করা এসব দায়িত্ব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক আজিজুর রহমান মল্লিক, ড. সালাউদ্দিন আহমদ, ড. মোশারফ হোসেন, ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলামসহ অন্য শিক্ষকরা কম-বেশি পালন করতেন। এজন্য শিক্ষকদের বেশ ঝুঁকিও নিতে হয়। প্রিয় ছাত্রদের জন্য ঝুঁকিও নিয়েছেন তাঁরা। আজিজুর রহমান মল্লিক তখন প্রশাসনের বিভিন্ন পদে জড়িয়ে গেছেন। তিনি ইতিহাসের অধ্যাপক, জিন্নাহ হলের প্রোভোস্ট, কলা অনুষদের ডিন। এছাড়া লাইব্রেরির দায়িত্বও ছিল তাঁর কাঁধে। ফলে বাড়তি দায়িত্বের চাপও ছিল তখন। সেসময় পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের কারণে অনেককেই 'দেশবিরোধী' ও 'সরকার বিরোধী' আখ্যা দিয়ে গ্রেফতার করা হতো। আর বরাবরই আজিজুর রহমান মল্লিককে কোর্টে গিয়ে ছাত্রদের জন্য জামিনদার হতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ অন্য অনেক শিক্ষক এ ব্যাপারে তাঁকে নিরুৎসাহিত করলেও তিনি একাজ করতেন নিজের তাগিদেই। শিক্ষক-ছাত্রদের মধ্যে আবার অনেকেই সরকারের গোয়েন্দা হিসেবেও কাজ করতেন।

এদিকে '৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, '৬৪-র শ্রমিক আন্দোলন, '৬৬-র ছয় দফা, ছাত্র সমাজের এগার দফা নানা দাবিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান তখন উত্তাল। কেউ কেউ স্বায়ত্বশাসনের দাবি বাদ দিয়ে সরাসরি স্বাধীনতার দাবিই উত্থাপন করেন। আইয়ুব খান তখন পাকিস্তানের শাসক। পশ্চিম পাকিস্তানে থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করেন মৌলিক গণতন্ত্রের নামে। এ দেশে তার চেলা মোনায়েম খাঁ আর নূরুল আমীন। পূর্ব বাংলায় তখন গোটা দেশ উত্তাল বিক্ষোভ-মিছিল-মিটিংয়ে। প্রায় প্রতিদিন টানটান উত্তেজনা। উত্তপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ও।

১৯৬৫ সালের শেষের দিকে আজিজুর রহমান মল্লিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হন। সেসময় তিনি সমস্ত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে দাঁড় করান। এবং সে কাজ করতে গিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের সঙ্গে তাঁকে অনেকবার বাক-বিতণ্ডা করতে হয়েছে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরুতেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর মানুষ প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। দেশ তখন মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগুতে থাকে।

উপাচার্য আজিজুর রহমান মল্লিকের পরামর্শে তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের এক জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ছিল 'কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ' নামের কেন্দ্র। সেখানকার ল্যাবরেটরিতে হাত বোমা, গ্রেনেড তৈরির প্রস্তুতি নেয়া হয়। ২৩ মার্চ আজিজুর রহমান মল্লিকের সভাপতিত্বে চট্টগ্রামের প্যারেড গ্রাউন্ডে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভাতেই তিনি জনতার ইচ্ছায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সভা থেকে বিরাট মিছিল চট্টগ্রামের রাজপথ অতিক্রম করে। সেই সভা চলাকালেই চট্টগ্রাম বন্দরে 'সোয়াত' জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর সময় বাঙালি জনতার দ্বারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাধা দেয়ার খবর আসে।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালির গণহত্যা শুরু করে। সেসময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা সবাই একযোগে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ক্যাম্পাস ছেড়ে দেয়। চট্টগ্রাম শহরের তখন পতন হয়ে গেছে। পরে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে রামগড় হয়ে আগরতলা চলে যান আজিজুর রহমান মল্লিক। সেখান থেকে প্রবাসী সরকারের তাজউদ্দিন আহমদের ডাকে কলকাতায় চলে যান তিনি।

কলকাতায় তখন অনেক বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক এসে জড়ো হয়েছেন। তাঁদের নিয়েই গড়ে তোলা হয় 'লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টিলিজেনসিয়া'। তার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রফেসর আজিজুর রহমান মল্লিক। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। মূলত এই সংস্থা তাঁর উদ্যোগেই তৈরি হয়। এই সংগঠনের শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে জনমত গঠন করতেন।

তারপরপরই প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত হয় 'বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি'। আজিজুর রহমান মল্লিককে সভাপতি ও ড. আনিসুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত করা হয়। শিক্ষক সমিতি বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে। প্রত্যেক শিবিরেই প্রাথমিক পর্যায়ে এক ধরনের স্কুল স্থাপন করে শিক্ষক সমিতি। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে পুস্তিকা, প্রচারপত্র তৈরি করে তা বিভিন্ন দেশের শিক্ষক সমিতি ও শিক্ষকদের নিকট পাঠানো হয়। যা দিয়ে বহির্বিশ্বেও শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসময় আজিজুর রহমান মল্লিক মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব অবস্থা নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর ধরসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদের সাথে দেখা করেন।

প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের বাইরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে প্রচার কাজ চালান সফলতার সাথে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রেই তিনি এই প্রচার কাজ সবচেয়ে বেশি চালান। কারণ তিনি এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি মাত্র ৩৬ দিনে আমেরিকার হার্ভাড, ইয়াল, বোস্টোন, পেনসিলভেনিয়া, স্ট্যানফোর্ড, নিউইয়র্ক, কলাম্বিয়া, বার্কলি, লংবিচ, শিকাগো, বাফেলো, নর্থ ক্যারোলিনা, টেক্সাসসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি বক্তব্য রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে দলটি জাতিসংঘে বাংলাদেশের সপক্ষে জনমত গঠন করার কাজে নিয়োজিত ছিল তার মধ্যে আজিজুর রহমান মল্লিক ছিলেন অন্যতম।

নয়মাস যুদ্ধ শেষে দেশ যখন স্বাধীন হওয়ার পথে, সবাই যখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখন একদিন তাজউদ্দীন আহমদ ড. আজিজুর রহমান মল্লিককে ডেকে পাঠালেন তাঁর অফিসে। তাজউদ্দীন বললেন, 'দেশে তো চলে যাবেন, দেশে যাওয়ার আগে রেডিওতে একটি বক্তৃতা দেওয়া খুবই জরুরি। দেশে এখন খুনোখুনি আরম্ভ হয়ে যাবে। রাজাকার দালাল যারা আছে তাদেরকে লোকে ধরে ধরে মারবে। তাদের বিচার না করে মারাটা খারাপ দেখাবে। তেমনি রক্তক্ষয়ও বাড়বে। বিশৃঙ্খলা বাড়বে। আপনাকে সবাই চেনে, আপনি কলকাতা রেডিও থেকে বক্তব্য রাখেন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে।' আজিজুর রহমান মল্লিক কলকাতা বেতার থেকে তখন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন।

স্বাধীনতার পরপরই দেশে ফিরে এসে তিনি ঠিক করলেন বিদেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে চলে যাবেন আর সেখানে বসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর বই লিখবেন। কিন্তু তা আর করা হয়ে ওঠেনি। ১০ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে আসেন। তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তোলার সংগ্রামে নেমে পড়েছেন সকল দেশপ্রেমিক মানুষ। দেশে ফেরার কয়েকদিন পরেই বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডেকে পাঠালেন গণভবনে। তিনি আজিজুর রহমান মল্লিককে বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার কথা বলেন। সেসময় শিক্ষা সচিব হিসেবে তিনি সফলতার সাথে ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। যার দ্বারা একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। এর কিছুদিন পর বঙ্গবন্ধু তাঁর কেবিনেটের সঙ্গে আলোচনা করে আবার তাঁকে ডেকে বললেন, তাঁকে ভারতের প্রথম হাইকমিশনার হিসাবে দায়িত্ব নিতে হবে। সঙ্গে থাকবে ভুটান আর নেপালের দায়িত্বও। মূল কাজ হবে তখনো পর্যন্ত যেসব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি তাদের সমর্থন আদায় করা। বঙ্গবন্ধুর কাছে মনে হয়েছে এ কাজের জন্য আজিজুর রহমান মল্লিকই উপযুক্ত ব্যক্তি। এর বাইরে তিনি আর কিছুই বলতে দিলেন না। বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে বাসায় পৌঁছার আগেই রেডিওতে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয় ভারতের প্রথম হাই কমিশনার হিসেবে। এই দায়িত্ব পালনকালে তিনি আফগানিস্তান ও আলজেরিয়াকেও বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে সফল হন।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে এক ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কট দেখা দেয়। যার পরিণতিতে দেশে দুর্ভিক্ষ হয়। সরকারের ভিতরে তখন নানা চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ভিতর খুব জোরেশোরেই জেঁকে বসেছে সুবিধাবাদীদের দল। যে কারণে একসময় তাজউদ্দীন আহমদের মতো নেতাকে বঙ্গবন্ধু অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেন। কিন্তু কে নেবে তাজউদ্দীনের মতো নেতার দায়ভার? রাজি না হলেও পরে তাজউদ্দীন ও আজিজুর রহমান আলোচনা করেন। আজিজুর রহমানকেই দায়িত্ব দেন বঙ্গবন্ধু। সেসময় আজিজুর রহমান মল্লিক বেশ দক্ষতার সাথেই নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে মোশতাক বাহিনী। আজিজুর রহমানকেও ভুল বুঝিয়ে অন্য কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার মতো মোশতাকের মন্ত্রীসভায় শপথ নিতে বাধ্য করা হয়। কথা ছিল মন্ত্রীসভার প্রথম সভাতেই বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু সে সম্পর্কে মোশতাক ছিলেন নিশ্চুপ। ওই বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই আজিজুর রহমান মল্লিক সকল ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত হতে থাকেন, যখন জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করার। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহটি ছিল এদেশের রাজনীতির জন্য প্রবল ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ। খালেদ মোশাররফের অভ্যূত্থান প্রচেষ্টা, জেল হত্যা, সিপাহী বিদ্রোহ, মোশতাক সরকারের পতন, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ ইত্যাদি নানা ঘটনা এই অল্প দিনেই ঘটে যায়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির অল্প দিনের মধ্যেই এসব দেখে তিনি মানসিকভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়েন। তাঁর মন বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ কোনো পদের লোভ তাঁকে কোনোদিন টানতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তিনি যত পালন করেছেন সব তাঁকে ডেকে নিয়েই দেয়া হয়েছে। যে কারণে মোশতাকের কেবিনেটে নিজের নাম অন্তর্ভুক্তি তাঁকে অশেষ মানসিক যাতনা দিয়েছিল।

যাই হোক, নিজের মানসিক এই টানাপোড়েন কাটানোর জন্য তিনি ঠিক করলেন আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যাবেন। ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের ১৫ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রফেসর এমিরিটাস হিসেবে নিয়োগ দান করে, যা একজন সফল শিক্ষকের জন্য খুবই সম্মানজনক। একই বছরের মার্চ মাসে তিনি বাঙালি মূলধনে গড়ে ওঠা প্রথম বাণিজ্যিক ব্যাংক 'ন্যাশনাল ব্যাংক'-এর অনারারি চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সাল থেকে আজিজুর রহমান মল্লিক এশিয়াটিক সোসাইটির কাজের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ হতে থাকেন। সোসাইটি থেকে প্রকাশিত জার্নালে তিনি মাঝে মাঝেই প্রবন্ধ লিখতেন। আজিজুর রহমান মল্লিকের পিএইচডি গ্রন্থ 'British policy of the Muslims in Bengal' এখান থেকেই প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। ১৯৮৩-৮৫ এই দু'বছর তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি বাংলা একাডেমিরও ফেলো হিসাবে কাজ করে আসছিলেন।

আজিজুর রহমান মল্লিক শেষ জীবনে এসে নিজের জীবনলিপি ওরাল হিস্টি হিসেবে বলেছেন, এবং পরে তা লিপিবদ্ধ হয়। যার নাম 'আমার জীবন কথা ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম'। সেই বইয়ের শেষে তিনি লিখেছেন, "আমি মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার শক্তিতে বিশ্বাস করি। আমার জন্ম যে দেশটিতে সেটি হয়তো 'ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা' নয়। কিন্তু এটুকু যেন সত্য হয় 'ভাইয়ের মায়ের এত স্নেহ...' তাহলেই সত্যি এ দেশটি ভরে উঠবে 'ধন ধান্যে ও পুষ্পে'। তা দেখবার সুযোগ আমার নাইবা হলো। আমার স্বপ্নটি যেন সত্য হয়। স্বপ্নটি সত্য হবে এমন বিশ্বাস নিয়েই যেন চলে যেতে পারি। আমার স্বপ্ন ও বিশ্বাস সত্যে পরিণত হয়েছে বহুবার। আশা করছি এক্ষেত্রেও সেটাই হবে।" সেই স্বপ্ন ও বিশ্বাস নিয়েই ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৯৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই বরেণ্য মনীষী।

সংক্ষিপ্ত জীবনী:
জন্ম:আজিজুর রহমান মল্লিকের জন্ম ১৯১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা জেলার ধামরাই থানার রাজাপুর গ্রামে। কিন্তু সার্টিফিকেটে তাঁর জন্ম তারিখ অন্য। সেসময় ১৬ বছর পূর্ণ না হলে কেউ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে পারত না। ফলে তাঁর বাবা কোর্টে গিয়ে এফিডেভিট করিয়ে আজিজুর রহমান মল্লিকের বয়স বাড়িয়ে দেন। ডিসেম্বরের স্থলে করা হল মার্চ মাস। ফলে তাঁর জন্ম তারিখ গিয়ে দাঁড়ায় ১৯১৮ সালের মার্চ।

বাবা-মা: আজিজুর রহমানের বাবা মোহাম্মদ ইসমাইল মল্লিক। মা বেগম সাজেদা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। পাঁচ ভাই, এক বোনের মধ্যে আজিজুর রহমান মল্লিক ছিলেন সবার বড়।

পড়াশুনা: মানিকগঞ্জ মডেল হাই স্কুল থেকে ১৯৩৪ সালে লেটারসহ প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা সরকারী কলেজে। ১৯৩৬ সালে এখান থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। পরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। ১৯৩৯ সালে তিনি অনার্স পাশ করেন আর ১৯৪০ সালে এম.এ.। ১৯৫১ সালে পিএইচডি ডিগ্রী করার জন্য বিলেত চলে যান। মাত্র ১ বছর ৮ মাসে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

কর্মজীবন: ১৯৪১ সালেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগাদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে মতের মিল না হওয়ায় তিনি চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে যান রাজশাহী সরকারী কলেজে। ১৯৫৪ সালে দেশে ফিরে এসে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৫ সালের শেষের দিকে আজিজুর রহমান মল্লিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হন। যুক্তরাষ্টের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান রিজিওনাল স্টাডিস বিভাগের প্রথম পূর্ণ অধ্যাপক, বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা সচিব, ভারতে (একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটান) বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত, দেশের প্রথম টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নির্বাচিত চেয়ারম্যান।

বিয়ে ও ছেলে-মেয়ে: ১৯৪২ সালে তিনি বিয়ে করেন রহমতুন্নেছাকে। তাঁদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।

মৃত্যু: ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৯৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই বরেণ্য মনীষী।

তথ্যসূত্র: জানুয়ারী, ২০১০ তারিখে আজিজুর রহমান মল্লিকের ছেলে ফারুক মল্লিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে এবং আজিজুর রহমান মল্লিকের জীবনলিপি 'আমার জীবন কথা ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম' নামক বইটি থেকে সহায়তা নিয় জীবনীটি লেখা হয়েছে।

লেখক : চন্দন সাহা রায়

Share on Facebook
Gunijan

© 2017 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .