<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
 
সর্বমোট জীবনী 317 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 17 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 10 )
পারফর্মিং আর্ট ( 11 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 8 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 154 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 1 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 0 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 0 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
ট্রাস্টি বোর্ড ( 12 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী
 
 লোক সাহিত্য বিশারদ সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী - নাসিমা আক্তার
trans
ভূমিকা
লোকসাহিত্য চর্চায় যে ক'জন সাহিত্য গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছিল তাদের মধ্যে লোকসাহিত্য বিশারদ মরহুম সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী অন্যতম। আধুনিক লোকসাহিত্য সৃষ্টির বেলায় তার প্রতিষ্ঠা কতখানি তা বিচারসাপেক্ষ। তবে লোকসাহিত্য সংগ্রহে ও গবেষণায় তিনি যে অবিসংবাদিতরূপেই প্রথম ও প্রধান ছিলেন তা নিঃসন্দেহ।

জন্ম
নেত্রকোনা জেলা সদর হতে আনুমানিক ১০কি.মি. দক্ষিণাংশে প্রায় ভাটি অঞ্চলের ক্ষুদ্র কাসিমপুর গ্রাম। সেই গ্রামে লোকসাহিত্যিক সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী সাহেবের জন্ম। তার জন্ম তারিখ সম্পর্কে কিছু মতভেদ রয়েছে। সার্টিফিকেট হতে জানা যায় ১৯০৮ খ্রি. ২২ অক্টোবর। আবার কেউ কেউ বলেন ১৮৯৬ সালে ২২ অক্টোবর তার জন্ম। তারিখটিই তার জন্ম তারিখ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু শ্রদ্ধেয় মনীষীরা সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরীর জীবনী লিখতে গিয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যাবলীর ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে ১৯০১ খ্রি.-কে সঠিক জন্মতারিখ হিসেবে যুক্তিগংগত মনে করেন।

বংশপরিচয়
তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোনা মহাকুমার কেন্দুয়া থানার অর্ন্তগত কাসিমপুর গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এই কাসিমপুর গ্রামের পরিচয় চিহ্ন হিসেবে নিজের নামের সাথে সংযুক্ত করে দিয়েই তিনি পরিচিত হন 'সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী' নামে। তার পিতা মুহাম্মদ নবী বক্স ও মাতা মোসাম্মৎ মেহেরজান। তার পিতামহের নাম মোহাম্মাদ আলী শেখ। সিরাজুদ্দিনের পিতৃব্য ছিলেন তিন জন- আজিম শেখ, নাজিম শেখ ও করিম শেখ।

শৈশবকাল
পিতৃহীন সিরাজুদ্দিন অত্যন্ত দুরন্ত ছিলেন। সমবয়সী গ্রাম্য বালকদের সঙ্গে খেলাধুলায় ও নানাধরনের দুরন্তপনায় তিনি মশগুল ছিলেন। 'গোল্লাছাট' ও 'মলদাইর' নামক গ্রাম্য ক্রীডা তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেউই কুলিয়ে উঠতে পারত না। নদীতে দলবেধে ঝাঁপাঝাঁপি করা ও সাঁতার কাটা। ষাড়ের আরঙ্গে হৈ-চৈ করে ঘুরে বেড়ানো, খালে-বিলে মাছ ধরা ইত্যাদি বাল্য ক্রিড়াতেই তার পিতৃবিয়োগত্তর কয়েকটি বছর কেটে যায়।

শিক্ষা জীবন
সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরীর বাল্য শিক্ষা শুরু হয় নিজ গ্রামের মক্তবে। সেখান থেকে কোরান শিক্ষা করার পর তাকে পাশের গ্রাম নরেন্দ্রনগরে তাঁর মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নরেন্দ্রনগর পাঠশালায় তিনি বাংলা শিক্ষা শুরু করেন। তৃতীয় শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই পিতৃবিয়োগ ঘটে। পিতৃবিয়োগের পর তাঁর মা মেহেরজানও কিছু দিনের জন্য নরেন্দ্রনগরে তার পিত্রালয়ে চলে যেতে বাধ্য হন। এভাবে ধীরে ধীরে সিরাজুদ্দিন মামার আশ্রয়ে বড় হতে লাগলেন। দুরন্তপনা সিরাজুদ্দিনের হৈ-চৈ আর লাফালাফিতে কেটে যায়। পিত্রবিয়োগের কয়েকটি বছর। আর সেই সঙ্গে চলতে থাকে গ্রাম্য নাট্যাভিনয় পালা গান ও কেচ্ছার আসরে নিয়মিত যোগদান। কয়েক বছর বিদ্যায়ের পড়াশোনার সঙ্গে একরূপ সংশ্রম বর্জিত হয়েই ছিলেন। সেই সময় নরেন্দ্রনগর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় 'মাইনর স্কুল' সেখানে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হত। মাইনর স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের অন্যতম মহিউদ্দীন এবং প্রধান শিক্ষক বিপিনচনদ্র্ ভট্টাচার্য উদ্যোগী হয়েই সিরাজুদ্দিনকে ভর্তি করে নেন। 'মাইনর' পরীক্ষা পাশ করার পর আর পড়াশোনা করার কোন সুযোগ রইল না। কাসিমপুর থেকে পাঁচ মাইল দূরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটিমাত্র স্কুল জয়নাথ চক্রবর্তী ইনস্টিটিউশন আশুজিয়া ১৮/১৯ বছর বয়সে তিনি আশুজিয়া জয়নাথ চক্রবর্তী ইনস্টিটিউশনে ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এই পিতৃহীন ও দরিদ্র্য কৃষক সন্তানের পক্ষে হাইস্কুলে ভর্তি হওয়া কিছুতেই সম্ভব হতো না যদিনা এই স্কুলের ছাত্র বৎসল শিক্ষক জয়চন্দ্র রায়ের সক্রিয় সহযোগিতা না পেতেন। সিরাজুদ্দিনের চেতনা ও স্বদেশপ্রীতি সঞ্চারে জয়চন্দ্র বাবুর প্রভাব খুবই গবীরভাবে কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু অভাব ও দারিদ্র সিরাজুদ্দিনের পড়াশোনায় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েই তিনি বাধ্য হলেন স্কুল ছেড়ে দিতে। বেড়িয়ে পড়েন রোজগারের সন্ধানে। একটা সুযোগও মিলে গেলো। অন্যতম শিক্ষক ফিরোজ খাঁ 'গুরু ট্রেনিং' পরীক্ষা দেবার জন্য এক বছরের ছুটি নেন ও সিরাজুদ্দিনকে স্থলাভিষিক্ত করে যান। ১৯২২ সালে ঐ স্কুলের পরিদর্শক সিরাজুদ্দিনের পাঠদানের কুশলতা ও সাহিত্য রসব্যাঞ্জনায় অত্যন্ত খুশি হন। রঘুনাথপুর পাঠশালাতেই তার স্থায়ী নিযুক্তি করে দিয়ে এক বছরের ছুটি মঞ্জুর করে যান। ১৯২৩ সালে জানুয়ারি মাসে নেত্রকোনা 'গুরু ট্রেনিং' স্কুলে প্রশিক্ষণের জন্য ভর্তি হন। যদিও বর্তমানে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ভর্তি না হয়ে কেউই প্রাইমারী ট্রেনিং ইনস্টিউটে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন না। কিন্তু সেকালে এরকম কোন বিধি নিষেধ ছিল না বলেই সিরাজুদ্দিন 'গুরু ট্রেনিং' স্কুলে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং পত্র লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। ১৯২৩ সালে তিনি ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে ইংরেজিসহ 'গুরু ট্রেনিং' স্কুলের প্রশিক্ষণ সফলতার সাথে সমাপ্ত করেন। ১৯২৪ সালে ১৯ জুন নেত্রকোনা মহকুমার স্কুলসমূহের পরিদর্শক কর্তৃক সাক্ষরিত অভিজ্ঞান পত্রটিতে উল্লেখ ছিল যে, 'গুরু ট্রেনিং' বাজিটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে সিরাজুদ্দিন নতুন শিক্ষা বিধান অনুসারে উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন করেন। জিটি পাস করার পর রঘুনাথপুর পাঠশালায় ফিরে আসেন এবং ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন এস.ডি.আই স্কুলে পরিদর্শনে আসেন। সিরাজুদ্দিনের প্রতিভা এবং চারিত্রিক গুণাবলীর প্রশংসা শুনলেন জমিদার ম্যানেজারের নিকট হতে। ১৯২৬ সালে ঢাকা নর্মাল স্কুলে ভর্তি হন এবং টিচারশীপ সার্টিফিকের পরীক্ষা দেন ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। এইখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ।

কর্ম জীবন
সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরীর কর্ম জীবনের শুরু হয় ১৯২১ সালে রঘুনাথপুর পাঠশালায় শিক্ষকতার মধ্যদিয়ে। এরপর শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে 'গুরু ট্রেনিং' ও ঢাকা নর্মাল স্কুল থেকে 'টিচারশীপ সার্টিফিকেট' পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং সে স্কুলের তৎকালীন শিক্ষক আব্দুর রশিদ সাহেবের সঙ্গে পরিচিত হন। রশিদ সাহেবের বাসা থেকেই কাসিমপুরী নর্মাল স্কুলে পড়াশোনা করেন। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯২৯ সালে তিনি নেত্রকোনা জেলার নিকটবর্তী বালি জুনিয়র মাদ্রাসায় পন্ডিতের কাজে যোগদান করেন। দুই বছর সেখানে কাজ করার পর বালি ত্যাগ করেন এবং ১৯৩১ সালের ২ জানুয়ারি মোহনগঞ্জ হাইস্কুলের ভার্নাকুলার নিযুক্ত হন। ১৯৩৫ সালের মে মাসে চাকরী ছেড়ে দিয়ে আব্দুর রশিদের বাসায় গিয়ে উঠেন। ১৯৩৬ সালের শেষের দিকে জামালপুর 'গুরু ট্রেনিং' স্কুলে হেড পন্ডিতের পদে অস্থায়ীভাবে নিযুক্তি লাভ করেন। পরে কিশোরগঞ্জ 'গুরু ট্রেনিং' স্কুলে চাকুরী পান। কিন্তু মেট্রিক পাস না থাকায় সে চাকুরী বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৪১ সালে তিনি কর্মচ্যুতির মুখোমুখি হলেন। তিনি যে পদে কর্মরত ছিলেন সেই পদে উপযুক্ত একাডেমিক শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের জন্য বিজ্ঞাপন প্রদান করলেন। ঢাকা রেঞ্চের তদানীন্তন স্কুল ইনসপেক্টর মিষ্টার জে. লাইড়ী তখন সিরাজুদ্দিনের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ করলেন অবিভক্ত বাংলার ডিরেক্টর অব ইনট্রাকশন নিজে। ডি.পি.আই অফিস থেকে ঢাকা রেঞ্চের স্কুল ইনসপেক্টরের নিকট লিখিত অফিসিয়াল পত্রে সেই হস্তক্ষেপের পরিচয় পাওয়া যায়। এরপরই 'গুরু ট্রেনিং' স্কুলে তিনি স্থায়ী নিযুক্তি পান। তবুও শেষ পর্যন্ত কাসিমপুরী তাঁর পদে পুনর্বহাল থাকতে পারলেন না। কারণ তিনি মেট্রিক পাস ছিলেন না। সেই সময়ে তাঁকে প্রাইমারী ট্রেনিং ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে শিশুদের শিক্ষাদান কার্যে নিযুক্ত করা হয়। এরপর তিনি ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ বদলী হয়ে আসেন এবং ১৯৮৫ সালে অবসরগ্রহণ করেন। তখন তিনি পেনশন পান ৮৩ টাকা ৫০ পয়সা হারে এবং গ্র্যাচুইটি হিসেবে পেয়েছিলেন ৩,৩২৫ টাকা ২০ পয়সা।

পারিবারিক জীবন
বংশ তালিকা হতে প্রাপ্ত মোঃ নবীবংশ সাহেবের দুই ছেলে শেখ জালাল উদ্দিন ও সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী। তাঁর কোন কন্যা সন্তান ছিল না। সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী ১৯৩৭ সালে ৭ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার সদরে অবস্থিত আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব সায়ীদুর রহমান-এর কন্যা শামসুন্নাহার নফিসা আক্তার খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের সময় তিনি (নফিসা) কিশোরগঞ্জের সরকারি এস.বি গালর্স হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। ঐ সময় চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বৃত্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তিনি ময়মনসিংহ জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। বিয়ের পর বিদ্যালয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। নফিসা আক্তার খাতুন নয় জন সন্তান-সন্তুতির জননী। কাসিমপুরী সাহেবের বড় ভাই শেখ জালাল উদ্দিন ওরফে টুকু মুন্সীর তিন ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ভাই জালালউদ্দিন বেশি লেখাপড়া জানতেন না। কুরআন শরীফ পাঠ করতে পারতেন এবং গ্রামের মুসলমানদের আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় কর্তব্য পালনে সহায়তা করতেন। তিনি অত্যন্ত সরল সোজা লোক ছিলেন। অপরিণত বয়সে বাংলা ১৩৪৬ সালে তিনি মারা যান। অপ্রাপ্ত বয়স্ক চার সন্তানের দায়িত্ব নিতে হয় সিরাজুদ্দিনকেই। তাদের লালন-পালন করে বিয়ে দিয়ে সংসারে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনিই। এদের সকলের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের সন্তানদের প্রতি ভালো করে নজর দিতে পারেনি। তবে ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত করতে না পারলেও একেবারে অশিক্ষিত রাখেননি কাউকেই।

ক্ষেত্রভিত্তিক অবদান
সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরীর জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। নিম্নে তার ক্ষেত্রভিত্তিক অবদানগুলো তুলে ধরা হলঃ সাহিত্যক্ষেত্রে সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরীর সাহিত্য সাধনার হাতে খড়ি ছাত্র জীবন থেকেই। তবে পুরোদস্ত্তর সাধনা শুরু হয় ত্রিশের দশকের গোড়ার দিকে মোহনগঞ্জ হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার সময় থেকে। ঐ সময় তিনি লিখেছেন:
'আমার কলম চলে সৃষ্টির কারণে
অবিরাম বৃষ্টির মতন, নৃত্যপাগল ছন্দে,
মৃত্তিকার তলদেশ করিয়া মন্দন, দিতে রূপায়ন
উন্মুখ যতসব কেঁদে মরে লভিতে রূপে গন্ধে
জীবনের মৌলিক অবদান।'

সিরাজুদ্দিন সাহিত্য জীবনের শুরুতে প্রচুর কবিতা ও গান লিখেছেন। শিক্ষানীতি সম্বন্ধে অনেক প্রবন্ধ তিনি ঐ সময়ে রচনা করেছেন। ত্রিশের দশকের গোড়ার দিকে তিনি পরিচিত হন তৎকালীন ঢাকার বিশিষ্ট সাহিত্যসেবী নলিনী কিশোর গুহের সজো। ঐ সময় বাংলা বাজার থেকে 'সোনার বাংলা' নামে একটি উন্নতমানের সাপ্তাহিক পরীক্ষা গুহ মহাশ সম্পাদনায় প্রকাশ হতো। কাসিমপুরীকে তিনি সোনার বাংলা রচনায় উৎসাহিত করেন। 'সোনার বাংলা' ছাড়াও ঢাকা থেকে আরও প্রকাশিত 'শান্ত', 'চাবুক' ও 'শিক্ষা সমাচার' নামক তিনটি সাময়িক পত্র ও কলকাতার 'মাসিক মোহাম্মদী'-তে অনেকগুলো রচনা প্রকাশিত হয়েছিল। ঐ সময়ে 'আজাদ', 'ইত্তেফাক', 'মাহেনও', 'কৃষিকথা' এবং বাংলা একাডেমী পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় তিনি বেশ কিছু রচনা প্রকাশ করেন। সিলেটের 'আল ইসলাহ' এবং ময়মনসিংহের 'আগামী' ও 'মহুয়া' নামক দুটি মাসিক পত্র এবং শেষ জীবনে নেত্রকোনার 'সৃজনী সাহিত্য পত্রিকা'-তেও তিনি লিখেছেন। এছাড়া তিনি অনিয়মিত সাহিত্য সংকলনেও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রচুর রচনা।
লোকসাহিত্য
লোকসাহিত্যের পরিবেশে লালিত সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী লোকসাহিত্য সংগ্রহে বিশেষ উৎসাহিত হয় ১৯৩৮ সাল থেকে। সে বছরই বাংলার লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞ আশুতোষ ভট্টাচার্যের উদ্যোগে কিশোরগঞ্জ শহরে 'পূর্ব ময়মনসিংহ' সাহিত্য সম্মিলনীর একাদশ বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সিরাজুদ্দিন বাংলার লোকসাহিত্য সম্পর্কে একটি তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধ পাঠ করে সুধীবৃন্দের সপ্রশংস দৃষ্টি অকর্ষণে সক্ষম হন। এতে সভাপতি ভাষাচার্য ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও সম্পাদক আশুতোষ ভট্টাচার্য উভয়েই তাঁকে লোকসাহিত্য সংগ্রহ করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে অনুপ্রাণিত করেন।
রচনাপঞ্জী
জীবৎকালে সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরীর তিনটি স্কুল পাঠ্যপুস্তক ও তিনটি লোকসাহিত্য বিষয়ক পুস্তক প্রকাশিত হয়। চল্লিশের দশকে 'ময়মনসিংহের ভূগোল' নামক একটি বই তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার প্রাইমারী স্কুলসমূহে পড়ানো হতো। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত আরও দুটি পাঠ্যপুস্তক: ১। আমার পড়ার বই (প্রাইমারী, ২য় শ্রেণী); ২। প্রাইমারী স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান (প্রাইমারী, চতুর্থ শ্রেণী)।
তাঁর লেখা সাহিত্য গ্রন্থগুলো হল
লোকসাহিত্য ছড়া : প্রকাশক হাসান জামাল, প্রকাশনীতে বাংলা একাডেমী, ঢাকা, 'প্রবন্ধ কথা' লেখক- সৈয়দ আলী আহসান, প্রথম প্রকাশ- ১লা বৈশাখ, ১৩৬৯ বাংলা।
লোকসাহিত্য ধাঁধাঁ ও প্রবাদ : প্রকাশক ফজলে রাবিব, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
'প্রবন্ধ কথা' লেখক- ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, প্রথম প্রকাশ- পৌষ ১৩৭৫ বাংলা, ডিসেম্বর ১৯৬৮ খ্রি.।
বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত পরিচিতি : প্রকাশক ফজলে রাবিব, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
'প্রবন্ধ কথা' লেখক- ডক্টর মযহারুল ইসলাম, প্রথম প্রকাশ- আশ্বিন বাংলা ১৩৮০, অক্টোবর-১৯৭৩। বর্তমানে তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্য অবস্থায় আছে।
বাংলাদেশের লোকসাহিত্যে পরিচিতি : ময়মনসিংহের জেলা পরিষদ এই বইয়ের পান্ডুলিপি ক্রয় করে নেয়। কিন্তু পরে এই মুহূর্তে প্রকাশের অক্ষমতা জানিয়ে এর কিছু অংশ জেলা পরিষদ পরিচালিত 'মহুয়া' নামক সাহিত্য মাসিকের কয়েকটি সংখ্যায় (১৯৭৬-৭৭) সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে।
ভাঙ্গাবীণা : কাসিমপুরী সাহেবের কতগুলো গান ও কবিতার সমষ্টি হচ্ছে ভাঙ্গাবীণা। ভাইট্যাল গাঙ্গের নাইয়া কতগুলো ভাটিয়ালি গানের সংগ্রহ। যেমন- 'কৃষিতে খনার বচন', 'কৃষিকথা' ইত্যাদি প্রকাশ করেছিলেন।
সাময়িক পত্রে প্রকাশিত রচনাসমূহ
সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরীর সাময়িক পত্রে প্রকাশিত রচনাসমূহের পূর্ণ তালিকা প্রস্ত্তত করা খুবই কঠিন। তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যে সব রচনা বিভিন্ন সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কিছু নিম্নে তুলে ধরা হলঃ
১. 'বাঁশি' মাসিক 'শান্তি' পত্রে, পৌষ ১৩৪২ সাল।
২. পৃথিবীর পরিচয়', মাসিক মোহাম্মদী, আশ্বিণ ১৩৪২ সাল।
৩. মাসিক মোহাম্মদী পত্রে 'মানুষ রতন' পৌষ ও মাঘ ১৩৪২ সাল।
৪. 'আলো ও আধাঁর', মাসিক 'শান্তি' পত্রে বৈশাখ ১৩৪৩ সাল।
৫. 'গোড়ায় গলদ', সাপ্তাহিক 'শিক্ষা সমাচার' ২৯ জানুয়ারি ১৯৩৫ সাল।
৬. 'আঁধারের বুকে' সাপ্তাহিক 'চাবুক' পত্রে ২২ জুন ১৯৩৫ সাল।
৭. 'সোনার ভারত', 'আপন সূরত' সাপ্তাহিক 'সোনার বাংলা' ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮ সাল।
৮. 'নারী ও পুরুষ' মাসিক 'শান্তি' পূজা সংখ্যা ১৩৪৩ সাল।
৯. 'মোহাম্মদীর ইউনিভার্সিটি সংখ্যা' সাপ্তাহিক 'মোহাম্মদী' ১৪ আগস্ট ১৯৩৬ সাল।
১০. 'শিক্ষা ও শিক্ষক' সাপ্তাহিক 'শিক্ষা সমাচার' ২৭ শ্রাবণ ও ভাদ্র ১৩৪৩ সাল।
১১. 'কোলে তুলে মান করিলে' সাপ্তাহিক 'সোনার বাংলা' পূঁজা সংখ্যা ১৩৪৩ সাল।
১২. 'পারের গান' মাসিক 'শান্তি' শ্রাবণ ১৩৪৪ সাল।
১৩. 'সোনার মানুষ' সাপ্তাহিক 'সোনার বাংলা' ১৪ নভেম্বর ১৯৩৮ সাল।
১৪. 'শিক্ষাদান কার্যে আর্টের প্রয়োজনীয়তা' সাপ্তাহিক 'শিক্ষা সমাচার' পূজা সংখ্যা ১৩৪৩ সাল।
১৫. 'রঙ্গিলা দেওয়াল' মাসিক 'সৌরভ' ফাল্গুন ও চৈত্র ১৩৪৪ সাল।
১৬. 'মাতা-পিতা ও সন্তান-সন্তুতি' সাপ্তাহিক 'শিক্ষা সমাচার' ১৮ আগস্ট ১৯৩৭ সাল।
১৭. 'সাহিত্যের আদর্শ'।
১৮. 'শিক্ষকের মান মর্যাদা' মাসিক 'শান্তি' পত্রে। পূজা সংখ্যা ১৯৩৯ সাল।
১৯. 'কৃষিতে খনার বচন' মাসিক 'কৃষিকথা' পত্রে অক্টোবর ১৯৬৪ থেকে এপ্রিল ১৯৬৫ পর্যন্ত।
২০. 'লোকসাহিত্য উরিগান', বাংলা একাডেমী পত্রিকা বৈশাখ-আষাঢ় ১৯৭২ সাল।

সম্মাননা
১৯৬৮ সালে নেত্রকোনা লোকসাহিত্য সংসদ কর্তৃক লোকসাহিত্য বিশারদ উপাধীতে ভূষিত করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি নেত্রকোনা জেলায় সর্বপ্রথম বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পান।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান
পাকিস্তানের পাকবাহিনীর অত্যাচারের ফলে ১৯৭১ সালে 'তঘমা-ই-খেদমত' উপাধী বর্জন করে বাঙ্গালী জাতির জন্য গৌরব আনয়ন করেন। (পরবর্তীতে পাকিস্তানীরা ঘোষণা দিয়েছিল যে, যদি কাসিমপুরী-কে ধরে দেওয়া হয় তবে ১০০০ টাকা পুরষ্কার)।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা
১৯৬৮ সালে নেত্রকোনা লোকসাহিত্য সংসদ কর্তৃক 'লোকসাহিত্য বিশারদ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কৃতি সাহিত্যিক হিসেবে ১৯৭৮ সালে ময়মনসিংহ সাহিত্য সম্মেলন কর্তৃক সম্মাননা প্রদান। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমান কর্তৃক আর্থিক সাহায্য এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক আর্থিক সাহায্য প্রদান করে। এগুলো তার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে পরিবার সূত্র থেকে জানা যায়।

মৃত্যু
সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলা ১৩৮৬ সালে ৩রা পৌষ কাসিমপুর গ্রামে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।

উপসংহার
আমার প্রিয় ব্যক্তি বা লেখক, যিনি আমার সারা জীবনের আদর্শ। বাস্তবে তিনি আমার থেকে দূরে কিন্তু তিনি আছেন আমার অন্তর জুড়ে। দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, জীবনকে স্মরণীয় করে তুলতে তিনিই রেখেগেছেন আমাদের প্রত্যেকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লোক সাহিত্য বিশারদরূপে সবিশেষ পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। আজীবন তিনি নিষ্ঠার সাথে লোক সাহিত্যের চর্চা করেছেন এ কারণেই তিনি লোকসাহিত্যের ইতিহাসে পরম শ্রদ্ধেয়।

Share on Facebook
Gunijan

© 2017 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by .