| দাবা খেলাকে রাণী হামিদ পুরোপুরি পেশা বলে মনে
করেননা। তারপরও কোনো কিছু
অর্জনের জন্য পেশাদারী হতে হয়, বিষয়টি মাথায় রেখে
১৯৮০ সাল থেকে রাণী হামিদ
বিমান বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে দাবা খেলছেন।
তিনি বলেন, "ভালো খেলার জন্য
পেশাদারিত্বের সুযোগ দরকার। তবে আমি দাবা খেলাকে
পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে
পারিনি। দাবার প্রতি দুর্বলতা থেকেই আমি দাবা
খেলতে আগ্রহী।" তিনি আরো বলেন,
"এখন দাবা খেলা এবং সংসার দুটোই আমার কর্মক্ষেত্র।
এই দুটো কর্মক্ষেত্র আমাকে
সমানভাবে সামলাতে হয়। একটি ছাড়া অন্যটি আমার
জীবনে অসম্পূর্ণ।"
ছোটবেলা থেকেই রাণী হামিদের খেলাধুলার প্রতি প্রবল
আগ্রহ ছিল। শৈশবে তিনি
দৌড়ে খুব ভালো ছিলেন। তিনি যখন কুমিল্লা কলেজের
ছাত্রী, তখন তার শিক্ষকদের খুব
আগ্রহ ছিল যেন তিনি জাতীয় পর্যায়ে দৌড়
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। সুযোগ
পেলে তিনি হয়তো একজন নামকরা এ্যাথলেট হতে
পারতেন। কিন্তু পরিবারের মেয়ে
দৌড়ানোর জন্য ঘরের বাইরে যাবে, এটা তাঁর বাবা
মায়ের পছন্দ ছিল না। পরিবারের
অনুমতি না পাওয়ার কারণে তিনি দৌড়বিদ হওয়ার সুযোগ
হারিয়েছেন।
রাণী হামিদের বাড়িতে দাবা ও টেনিস খেলার চর্চা
ছিল। বিশেষ করে এ দুটো খেলার
প্রতি তাঁর বাবার ছিল বিশেষ আগ্রহ। বাবার আগ্রহ
থেকেই রাণী হামিদের দাবার
প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সুযোগ পেলেই তিনি ছোট ভাইয়ের
সাথে দাবা খেলতেন। সব সময়
দাবা খেলা যেত না। বিশেষ করে বাবা যখন বাড়িতে
থাকতেননা তখন রাণী ভাইদের
সাথে দাবা খেলতেন। সব সময় দাবা খেলা বাবা মা
পছন্দ করতেন না। দাবা খেলার
প্রতি আগ্রহ থাকলেও পর্দাপ্রথা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির
কারণে বিয়ের আগে রাণী
দাবা খেলার জন্য বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেন নি।
মূলত: রাণী পেশাদারী দাবা খেলা শুরু করেন বিয়ের
পরে। খেলাধুলার প্রতি তাঁর
স্বামীর আগ্রহ ও উত্সাহ থাকায় তিনি দাবা খেলার
প্রতি জোর দেন। রাণী বলেন,
"আমাদের সময় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এত
সহজলভ্যতা ছিল না। এজন্য দাবা
বিষয়ে কোন তথ্য জানা খুব কঠিন ছিল। তাছাড়া দাবার
বই বা কোচিং দেওয়ার মতো
কাউকে পাওয়া যেত না। কিন্তু আমার স্বামী আব্দুল
হামিদ প্রতিকূল পরিবেশ কাটিয়ে
আমাকে দাবা অনুশীলনের সুযোগ করে দিয়েছেন। বিয়ের
পর স্বামীর অনুপ্রেরণায় আমি
দাবাড়ু হিসেবে খ্যাতি অর্জন করতে পেরেছি। তিনি
সহযোগিতা ও সুযোগ সৃষ্টি না করে
দিলে হয়তো আমাকে আজকের স্থানে আসতে অনেক কষ্ট
করতে হতো। এজন্য আমি আমার স্বামী
আব্দুল হামিদের প্রতি কৃতজ্ঞ।"
১৯৭৪/৭৫ সালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-এর কোয়ার্টারে
থাকার সময় রাণী হামিদ জাতীয়
দাবা চ্যাম্পিয়ন ডঃ আকমল হোসেনের প্রতিবেশি ছিলেন।
তাঁর সংস্পর্শে সহযোগিতায়
তিনি ১৯৭৬ সালে প্রথম মহসিন দাবা প্রতিযোগিতায়
অংশগ্রহণ করেন। তাঁর সাথে ঢাকা
মেডিকেল কলেজের ছাত্রী দীপ্তি ও বীথিসহ কয়েকজন
নারী দাবা খেলায় অংশগ্রহণ
করেছিলেন।
১৯৭৭ সালে নবদিগন্ত সংসদ দাবা ফেডারেশন নারীদের
জন্য প্রথমবারের মতো
আলাদাভাবে দাবা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এই
অয়োজন '৭৮ ও '৭৯ সালেও করা হয়।
তিনবারেই রাণী হামিদ চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৭৯ সনে
ঢাকায় উন্মুক্ত দাবা প্রতিযোগিতায়
অংশগ্রহণ করে রাণী হামিদ চ্যাম্পিয়ন হন। অর্থাত্
একই বছর তিনি দু'বার চ্যাম্পিয়ন
হন। এরপর থেকেই তিনি একের পর এক জাতীয় ও
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ
করেন এবং কৃতিত্ব অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক মানের
কোনো কোচিং ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই
প্রথমবারের মতো তিনি ১৯৮১ সালে ভারতের
হায়দারাবাদে প্রথম এশিয় চ্যাম্পিয়নশিপে
অংশগ্রহণ করে সুনাম অর্জন করেন। তিনি কমনওয়েলথ এর
একজন শীর্ষ দাবা খেলোয়াড়।
আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার, জাতীয় ও বৃটিশ নারী
দাবা চ্যাম্পিয়ন। তিনি এ পর্যন্ত
তিনবার বৃটিশ নারী দাবা চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব
অর্জন করেছেন। এই গৌরব অর্জন
বাঙালি নারীদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ
ব্রিটিশ মহিলা দাবা খোলোয়াড়রা
যখন বাঙালি নারী রাণী হামিদের কাছে পরাজিত
হচ্ছিলেন তখন তাদের মধ্যে এক
প্রকার হীনমন্যতা কাজ করে। তারা দাবি তোলে,
ব্রিটিশ মহিলা জাতীয়
চ্যাম্পিয়নশিপে অন্যদেশের নারীরা খেলতে পারবে না।
পরে অন্যদেশের নারীদের
ব্রিটিশ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা বন্ধ করে দেয়া
হয়। রাণী হামিদ বলেন, এখন
শুধু ব্রিটিশ নারীরা খেলে এবং তারাই চ্যাম্পিয়ন হয়।
রাণী হামিদ তিনবার বৃটিশ
ওমেন দাবা চ্যাম্পিয়ন হয়ে গর্বিত। এই গর্ব
বাংলাদেশেরও।
রাণী হামিদ দাবা অলিম্পিয়াডে ৫ম মহিলা যিনি
যোগ্যতার ভিত্তিতে অলিম্পিয়াডে
জাতীয় পুরুষ দলের হয়ে খেলেছেন। ১৯৮৯ সনে ঢাকায়
অনুষ্ঠিত কাসেদ আন্তর্জাতিক
মহিলা দাবায় যৌথ চ্যাম্পিয়ন হন রাণী হামিদ। ১৯৭৯
থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি
ছয়বার জাতীয় মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন
হন এছাড়া ১৯৮৮, '৯০,
'৯২, '৯৬, '৯৮, '৯৯, ২০০১,'০৪ ও '০৬ এ জাতীয়
মহিলা দাবা
চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হন। ২০০৬ পর্যন্ত তিনি মোট
১৫ বার জাতীয় মহিলা দাবা
চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেছেন।
বাংলাদেশ এতবার চ্যাম্পিয়ন
হবার রেকর্ড আর নেই।।২০০৫ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত
আন্তর্জাতিক মহিলা দাবা
চ্যাম্পিয়নশিপে রাণী অংশগ্রহণ করেন। এই
প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে
তিনি বাংলাদেশের সুনাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরো
বৃদ্ধি করেন।
|