<bgsound src="flash/guni.wav">
 
Links
 
এ পর্যন্ত পড়েছেন
জন পাঠক
 
সর্বমোট জীবনী 287 টি
ক্ষেত্রসমূহ
সাহিত্য ( 37 )
শিল্পকলা ( 18 )
সমাজবিজ্ঞান ( 8 )
দর্শন ( 2 )
শিক্ষা ( 18 )
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ( 8 )
সংগীত ( 9 )
পারফর্মিং আর্ট ( 8 )
প্রকৃতি ও পরিবেশ ( 2 )
গণমাধ্যম ( 7 )
মুক্তিসংগ্রাম ( 129 )
চিকিৎসা বিজ্ঞান ( 3 )
ইতিহাস গবেষণা ( 0 )
স্থাপত্য ( 1 )
সংগঠক ( 8 )
ক্রীড়া ( 6 )
মানবাধিকার ( 2 )
লোকসংস্কৃতি ( 0 )
নারী অধিকার আন্দোলন ( 2 )
আদিবাসী অধিকার আন্দোলন ( 1 )
যন্ত্র সংগীত ( 0 )
উচ্চাঙ্গ সংগীত ( 0 )
আইন ( 1 )
আলোকচিত্র ( 3 )
সাহিত্য গবেষণা ( 0 )
নেত্রকোণার গুণীজন
উপদেষ্টা পরিষদ
গুণীজন ট্রাষ্ট-এর ইতিহাস
"গুণীজন"- এর পেছনে যাঁরা
Online Exhibition
New Prof
সুলতানা সারওয়াত আরা জামান আলমগীর কবির তরুবালা কর্মকার
 
 

GUNIJAN-The Eminent
 
এ. এম. হারুন অর রশীদ
 
 
trans
তাঁর নাম হয়তো অনেকে শুনেছেন একজন পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে, কেউ হয়তো তাঁকে জানেন শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে, অথবা অনেক কাজে ভীষণ ব্যস্ত থাকা সমাজের একটা অংশের কাছে হয়তো তিনি একেবারেই অপরিচিত, অচেনা একজন মানুষ। তিনি শুধু একজন পদার্থবিজ্ঞানীই নন, বিজ্ঞান গবেষণায় একটি নিবেদিত প্রাণ নন, তিনি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তিনি সাম্যবাদী, সৎ, আদর্শবান ও হৃদয়বান, আত্মপ্রচারবিমুখ পরিপূর্ণ একজন মানুষ-যিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্মম সত্য কথাটি বলতে পারেন। যে মানুষটি ধর্ম-বর্ণের তর্কে সবসময় নিরপেক্ষ থাকতে জানেন আর দেশের সাধারণ মানুষের জন্যে এখনও কিছু করার স্বপ্ন দেখেন- তিনি আমাদের দেশের গর্ব, অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ।

ছেলেবেলায় অন্য সবার মতো খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-গুজব সবই করতেন তিনি। কৃষ্ণনগরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করা সব শিক্ষকের প্রিয় এই 'হারুন' তাঁর স্কুল ও কলেজের কোনো পরীক্ষায় কখনো দ্বিতীয় হননি। পরবর্তীতে বাবার প্রিয় বিষয় পদার্থবিজ্ঞানকে তিনি বেছে নিয়েছেন নিজেরও প্রিয় বিষয় হিসেবে, উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন, গবেষণা করেছেন পৃথিবীর বিখ্যাত সব পদার্থবিজ্ঞানীর সাথে। এখনকার সময়ে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একমাত্র মুসলমান পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আব্দুস সালামের সঙ্গে তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি যখন ট্রিয়েস্টে ছিলেন, ঠিক সে সময়েই অধ্যাপক সালাম আই.সি.টি.পি. (International Centre for Theoretical Physics, Miramare, Trieste.) এবং থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমী অব সায়েন্সেস (Third World Academy of Sciences) প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশে ও দেশের বাইরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য ছাত্র- ছাত্রীদের তিনি শিক্ষা দিয়েছেন, তাদের সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। জীবনের বিভিন্ন সময় পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত থেকে সবশেষে তিনি শিক্ষকতা করার জন্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। আজও তিনি এই প্রতিষ্ঠানে এই মহান ব্রতে যুক্ত আছেন। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানসূচক "বোস অধ্যাপক" (পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কোনো বিশিষ্ট শিক্ষককে সম্মানিত করার জন্যে বাংলাদেশের বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়কার শিক্ষক ড. সত্যেন বোসের নাম অনুসারে "বোস অধ্যাপক" উপাধিটি প্রথম প্রবর্তন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। বর্তমানে অধ্যাপক হারুন অর রশীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউ.জি.সি. প্রফেসর (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন অধ্যাপক) হিসেবে যুক্ত আছেন। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি আরও অনেক বিরল সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন।

 জন্ম ও বংশ পরিচয়
trans
এ. এম. হারুন অর রশীদ (আবুল মকসুদ হারুন অর রশীদ) ১৯৩৩ সালের ১লা মে বরিশাল জেলার নলছিটি উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মকসুদ আলী ছিলেন বরিশাল জেলার প্রথম ব্যক্তি যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সে এম.এসসি. ডিগ্রি অজন করেছিলেন। এম. এসসি. পাশ করার পর তিনি কৃষ্ণনগর কলেজে শিক্ষকতা করেন (বাংলা বিভাগ হওয়ার আগে নদীয়া জেলার একটা সাবডিভিশন ছিল কুষ্টিয়া, আর তার সবচেয়ে বড় শহর ছিল কৃষ্ণনগর)। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাগ-এর পর মকসুদ আলী ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর কিছুদিন কারমাইকেল কলেজে (বর্তমান রংপুর কারমাইকেল কলেজ) থাকার পর সেখান থেকে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন A.D.P.I. (Assistant Director of Public Instruction) হয়ে। এখানে চাকুরিরত থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হওয়ার কিছু পরে একদিন তাঁর পরিচিত কিছু জুনিয়র কলেজ শিক্ষক যারা কখনও মুক্তিযুদ্ধ করেননি, তাঁর কাছে এসে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দাবী করেন। এতে জনাব মকসুদ আলী অস্বীকৃতি জানালেও যখন তারা পিছু ছাড়ছিলেন না তখন একদিনের নোটিশে তিনি ঐ চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। সারাজীবন সততা আর আদর্শের সাথে পথ চলে প্রায় ৬৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। এর দুই বছর পর ড. রশীদের মা জাহানারা বেগমও ৬০ বছর বয়সে মারা যান।

ড. রশীদের দাদার নাম ছিল মৌলবী জাবেদ আলী মুন্সী। ড. রশীদের জন্মের আগেই তিনি মারা যান। নানা আকরাম আলী মুন্সী ছিলেন বাহাদুরপুর গ্রামের অত্যন্ত নামকরা এবং সম্ভ্রান্ত একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর সিনিয়র উকিল আব্দুল মো. ওহাব সাহেব যখন পাকিস্তানের পার্লামেন্টের স্পিকার হলেন তখন তিনি ওহাব সাহেবের অফিসে কাজ করতেন। তিনি এ. কে. ফজলুল হক সাহেবের খুব পরিচিত লোক ছিলেন। এ. কে. ফজলুল হক যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন বাংলার মুসলমান চাষীদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। তাদের টাকা পয়সা বলতে কিছুই ছিল না। তাই তারা চাষাবাদের জন্য গ্রামের মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ঋণ করতো। মহাজনদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু। চাষীরা ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে চক্রবৃদ্ধি হারে তা বেড়ে তাদের একেবারে সর্বশান্ত হওয়ার মতো অবস্থা হতো। চাষীদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্যে ফজলুল হক সাহেব ঋণ সালিসি আইন নামে একটি আইন করলেন এবং ঋণ সালিসি বোর্ড নামে একটি বোর্ড গঠন করলেন। ড. রশীদের নানা তখন তাঁর এলাকায় ঐ বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন। তাঁর বাড়ির সামনে একটা বিরাট ঘর তৈরি করে সেখানে তিনি বসতেন আর গ্রামের সব লোক তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সেখানে আসতো। যেসব চাষী মহাজনের ঋণের টাকা শোধ করতে পারতো না তারা আসতো দরখাস্ত নিয়ে। তখন বোর্ডে তাদের বিচার করা হতো এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চাষীদের মাফ করে দেওয়া হতো। এছাড়া গ্রামের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে যেমন নলছিটি থানা থেকে একেবারে গ্রাম পর্যন্ত রাস্তা তৈরির ব্যাপারে তাঁর নানার ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে বেশি। ফজলুল হক সাহেবের আরও বিভিন্ন কাজ যেমন ঢাকার ইডেন কলেজ, কলকাতায় মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন গ্রামে স্কুল স্থাপন করা প্রভৃতি কাজে তাঁর নানা বিশেষভাবে জড়িত ছিলেন। গ্রামের লোকেরা তাই তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতো।

ড. রশীদের একমাত্র মামা শামসুদ্দীন আবুল কালাম ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত নামকরা একজন কথাসাহিত্যিক ও উপন্যাসিক। তখনকার সময়ে তিনি ছিলেন উভয় বাংলায় অত্যন্ত পরিচিত একমাত্র মুসলমান গল্প লেখক। কলেজ জীবনে তিনি নিখিল বঙ্গ ছাত্র কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন এবং আর. এস. পি. পার্টির সঙ্গে যুক্ত থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকায় এসে প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রচার ও তথ্য দপ্তরে সহকারী পরিচালক পদে যোগদান করেন। পরে তিনি ঐ অফিসেই 'মাহে নও' পত্রিকার সম্পাদক হন। ষাটের দশকে তিনি রোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ডি লিট' উপাধি এবং রোমের এক্সপেরিমেন্টাল সেন্টার অব সিনেমাটোগ্রাফি থেকে চলচ্চিত্রবিষয়ক ডিপ্লোমা লাভ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুজিবনগর সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের ব্যাপারে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। শামসুদ্দীনের মুখ্য পরিচয় একজন কথাশিল্পী হিসেবে। জীবনের শেষদিকে শামসুদ্দীন আবুল কালাম ইউনেস্কোর কিছু ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করেন। তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক ভিক্টর ডি সিলভার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ১৯৯৭ সালের ১০ই জানুয়ারি রোমে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয় (তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, খণ্ড-৯ (রহি-সখি), পৃষ্ঠা-২৮৮, সংগ্রাহক- গোলাম কিবরিয়া পিনু; এবং পাবলিক লাইব্রেরি, শাহবাগ, ঢাকা)।

তিন ভাই আর পাঁচ বোনের মধ্যে ড. রশীদ সবার বড়। মেজভাই এ. এম. জাহাঙ্গীর কবীর একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী, আর ছোটভাই এ. এম. জাহিদ রেজা পেশায় একজন ডাক্তার। পাঁচ বোন রানী, মীরা, বীনা, খুকু আর শেফু।

 শৈশবকাল
trans
কৃষ্ণনগর কলেজে বাবার শিক্ষকতার সূত্র ধরে ড. রশীদের শৈশব কেটেছে পশ্চিম বাংলার কৃষ্ণনগরেই। গ্রীষ্মের ছুটিতে কলেজ যখন বন্ধ হতো তখন তাঁর বাবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে কৃষ্ণনগর থেকে বরিশালে গ্রামের বাড়িতে আসতেন। গ্রামে আসতে হলে কৃষ্ণনগর থেকে ট্রেনে করে খুলনা আসতে হতো, খুলনায় স্টীমার ধরে বরিশালে, তারপর সেখান থেকে নৌকা করে তাঁদের গ্রামে যেতে হতো। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. রশীদ বলেন, 'কৃষ্ণনগর থেকে বরিশাল আসার সময় প্রায় প্রত্যেকবারই আমার মা স্টীমারে বসে বসে আমার সঙ্গে গল্প করতেন- এটাই আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।' গ্রামে যাওয়া বলতে আসা হতো মূলত নানার বাড়িতে। নানার কাছে তিনি ছিলেন পরম আদুরে। নানা যখন চেয়ারম্যান ছিলেন তখন গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজগুলো নিজের চোখেই দেখেছেন তিনি। নানার বাড়ি থেকে একটু দূরেই দাদার বাড়ি, মানে তাঁদের নিজ বাড়ি, গ্রামের নাম ছিল গোয়াইলবাড়ী, সেখানে যেতে হতো নৌকা করে। নানার বাড়িতে গেলেই দাদী এসে তাঁকে নিয়ে যেতেন সেই বাড়িতে, নিজের কাছে রাখতেন কিছুদিন। দাদা না থাকলেও দাদীর সাথে দিনগুলো তাঁর অত্যন্ত আনন্দেই কাটতো।

ছোটবেলায় খেলতে খুব ভালো লাগতো ড. রশীদের। তাঁদের কৃষ্ণনগরের বাড়ির কাছেই কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল ছিল। স্কুলের বিশাল খেলার মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি এসব নিয়মিতই খেলতেন। স্কুলের টিমেও অন্যদের তুলনায় তিনি ভালোই খেলতেন। প্রায় সবরকমের খেলা খেললেও তিনি জীবনে কখনো তাস খেলেননি। কিন্তু ঢাকায় আসার পর থেকে খেলার জায়গার অভাব ও পড়াশোনার চাপের কারণে আর কোনোরকম খেলাধুলাই করা হয়নি।

ড. রশীদের বাবা-মা দুইজনেই খুব সংস্কৃতমনা উদার বিদগ্ধ মানুষ ছিলেন। বাবা সবসময় সবার সাথে গান-বাজনা নিয়ে কথা বলতেন। বাবার খুব ইচ্ছা ছিল ছেলেকে গান শেখাবেন। সরোজ আচার্য্য নামে একজন গানের শিক্ষকও রেখে দিয়েছিলেন ছেলের জন্যে। তাঁর কাছে বেশ কিছুদিন গান শিখেছিলেন ড. রশীদ। ছোট ভাই-বোনদের কথামতো খালি গলায় তিনি নাকি "ভালোই গাইতেন"। কিন্তু ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাগ হয়ে গেলে ঢাকায় এসে আর গান শেখা সম্ভব হয়নি।

 শিক্ষাজীবন
trans
ছয় বছর বয়সে কৃষ্ণনগরের রামবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে ড. রশীদ তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেন। সেখানে কয়েক বছর পড়ার পর তাঁর বাবা তাঁকে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেন। স্কুলটা ছিল খুব নামকরা। স্কুলের যে বিরাট ভবনটায় ক্লাস হতো সেটা মনমোহন বসু নামে একজন খুব নামকরা ব্যারিস্টারের বাড়ি ছিল, যা তিনি মারা যাওয়ার আগে ঐ স্কুলে দান করে দেন। তখন ঐ স্কুলে তিনি ছাড়া আর মুসলমান ছাত্র ছিল মাত্র কয়েকজন। পড়াশুনায় ভালো বলে স্কুলের সবার কাছে তিনি "ভালো ছেলে" বলেই পরিচিত ছিলেন, আর শিক্ষকদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত স্নেহের পাত্র। বন্ধু নিশাপতি মুখার্জী, ক্ষিতিশচন্দ্র চক্রবর্তী, দেবদাস ভট্টাচার্য, রজত মুখার্জী ইত্যাদি সবার কাছেই তিনি ছিলেন ভালোবাসার পাত্র। স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্যে বা ক্লাসে ভালো উপস্থিতির জন্যে প্রতিবারই তিনি বিভিন্ন বই পুরস্কার পেয়েছেন। সেগুলির মধ্যে সত্যজিৎ রায়ের "আম আটির ভেঁপু" বইটি ছিল তাঁর খুবই প্রিয়।

স্কুলে পড়ার সময় ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাস এবং আরও অনেক বড় বড় ব্যারিস্টারের নাম শুনে তাঁর ইচ্ছা হয়েছিল বড় হয়ে ব্যারিস্টার হবেন। তবে কলেজে ওঠার পর থেকে সে ইচ্ছা আর হয়নি। কলেজে আসার পর থেকেই তিনি পদার্থবিজ্ঞান পড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই তখন থেকে এখন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের উপরই গবেষণা করে চলেছেন। তাঁর পদার্থবিজ্ঞানে আসার পিছনে প্রধান প্রেরণা ছিলেন তাঁর বাবা। বাবাও ছাত্রজীবনে পদার্থবিজ্ঞানের খুব ভালো ছাত্র ছিলেন এবং পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন খুবই নামকরা।

দশম শ্রেণী পর্যন্ত ড. রশীদ কৃষ্ণনগরের ঐ স্কুলেই লেখাপড়া করেছেন। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাগ হলে তাঁর বাবাকে বদলি করে ঢাকা পাঠানো হলো। ঢাকা এসে বাবা ঢাকা কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন। পরিবারের বাকিরা তখনও কৃষ্ণনগরেই থেকে গেলেন। বড় ছেলে হওয়ায় বাবার অনুপস্থিতিতে তখন পরিবারের অভিভাবক হলেন ড. রশীদ। এর প্রায় বছরখানেক পরে ১৯৪৮ সালের প্রথমদিকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাবা ঢাকায় আসলেন। ট্রেনে করে ঢাকায় আসার সময় দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর স্কুল থেকে উপহার পাওয়া সেই "আম আটির ভেঁপু"সহ অন্য বইগুলি হারিয়ে যায়। ঢাকা এসে তাঁর বাবা তাঁকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। তখন তাঁর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার মাত্র তিন মাস বাকি ছিল। এখানে তাঁর কোনোকিছুই ভালো লাগতো না, বারবার কৃষ্ণনগরের সেই স্কুলটার কথা মনে পড়তো। নতুন স্কুলে ক্লাস তেমন একটা করা হয়নি। তিনি ১৯৪৮ সালে তত্‍কালীন East Bengal Secondary Education Board এর অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে স্টারমার্কস সহ তিনটি বিষয়ে লেটার মার্কস (শতকরা ৮০ নম্বর এবং তার উপরে) পেয়ে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম শ্রেণীতে চতুর্থ স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন এবং এই ফলাফলের জন্যে একটি প্রথম গ্রেড সরকারি বৃত্তি লাভ করেন।

তিনি ১৯৫০ সালে ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স পরীক্ষায় স্টারমার্কসসহ চারটি প্রধান বিষয়ের সবগুলিতে (ইংরেজী, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান ও গণিত) লেটার মার্কস পেয়ে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন এবং এই ফলাফলের জন্যেও একটি প্রথম গ্রেড সরকারি বৃত্তি লাভ করেন। তাঁর ইংরেজিতে লেটার মার্কস পাওয়াটা ছিল তখনকার সময়ে একটা বিরল ঘটনা।

এরপর তিনি এসে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। তিনি ১৯৫৩ সালে এই বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে বি.এসসি. সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ঐ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্নাতকের মধ্যে সমন্বিতভাবে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার জন্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজা কালীনারায়ণ বৃত্তি লাভ করেন।

তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পুনরায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওভারসীস বৃত্তি (Overseas Scholarship) নিয়ে উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Glasgow, UK) যান।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি প্রফেসর আর. জি. মুরহাউজ এবং প্রফেসর বি. এইচ. ব্রান্সডেনের (Professor R.G. Moorhouse and Professor B.H. Bran sden) তত্ত্বাবধানে ক্ষেত্র তত্ত্বে টাম-ডানকফ আসন্ন মান (Tamm-Dancoff Approximation in Field Theory) ব্যবহার করে কে-মেসন নিউক্লিয়ন-এর একটি সমস্যার উপর কাজ করে ১৯৬০ সালে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

 কর্মজীবন
trans
ড. রশীদের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৬ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এসসি. পাশ করার পরপরই চেয়ারম্যান এবং হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট অধ্যাপক শচীন মিত্র তাঁকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব করেন। স্যারের কথামতো তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

এরপর তিনি যোগ দেন ঢাকাস্থ আনবিক শক্তি কমিশনে (Atomic Energy Commision, Dhaka) . এখানে তিনি ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত প্রথমে সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার এবং পরবর্তীকালে প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট-এর তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং পরবর্তীকালে পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বোস সেন্টার ফর এডভান্সড স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ -এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন এবং ১৯৮৫ থেকে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত (১৯৯৩ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন) তিনি ঐ বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সেন্টারের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন।

১৯৯৩ সালে তিন বত্‍সরের জন্য ড. রশীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোস অধ্যাপক নিযুক্ত হন। তিনি ২০০৬ সালে ইউ.জি.সি. ( U.G.C.- University Grants Commission) প্রফেসর নিযুক্ত হন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন :
১. ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট (Member of the Senate and Syndicate) -এর সদস্য ছিলেন।

২. ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমীর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।

৩. তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ (Asiatic Society of Bangladesh)- এর সদস্য।

৪. তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স (Bangladesh Academy of Science) - এর ফেলো ও সহসভাপতি ছিলেন।

৫. বাংলাদেশ সরকারের ন্যাশনাল কারিকুলাম কমিটি এবং এক্সামিনেশন রিফর্মস কমিটির (National Curriculum Committee as well as of Examination Reforms Committee, Govt. of Bangladesh) সদস্য হিসাবে তিনি কাজ করেছেন।

৬. তিনি দ্য আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি (The American Physical Society)- এর সদস্য ছিলেন।

৭. ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।

৮. ১৯৯২ সালে তিনি থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমী অব সায়েন্সেস (Third World Academy of Sciences) -এর ফেলো নির্বাচিত হন।

৯. তিনি ১৯৭২, ১৯৮৬ এবং ১৯৯৩ সালে নোবেল প্রাইজ নমিনেশন কমিটির সম্মানিত সদস্য হিসেবে কাজ করেন।

১০. তিনি ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ফিজিক্স গ্রুপ-এর অন্যতম সদস্য।

১১. তাঁকে ২০০৭ সালের ৩রা ডিসেম্বর বিজ্ঞান গবেষণা ও বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চায় সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলা একাডেমী সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করা হয়।

 গবেষণামূলক অভিজ্ঞতা
trans
গবেষণা কাজের জন্য ড. রশীদকে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও আলোচনা সভায় যেতে হয়েছে। এখানে তার ধারাবাহিক বিবরণ তুলে ধরা হলো:
তিনি তাঁর এম.এসসি. ডিগ্রি সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় কাজগুলোর অংশ হিসেবে এক্সরে মেথড-এর মাধ্যমে ট্রাই ফিনাইল মিথেনের স্ফটিক গঠনের (Crystal Structure of Tri-Phenyl Methane by X-ray Methods) উপরে একটি এম.এসসি. থিসিস উপস্থাপন করেন।

তিনি ১৯৫৬ সালে যুক্তরাজ্যের হারওয়েলের এটমিক এনার্জি রিসার্চ এস্টাবি্লশমেন্ট (Atomic Energy Research Establishment, Harwell, U.K.) থেকে রিয়্যাক্টর ফিজিক্স (Reactor Physics -এর উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

- তিনি ১৯৬০ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসপার্সন রিলেশন-এর উপরে সামার ইন্সটিটিউটে (Summer Institute on Dispersion Relations in Edinburgh) অংশগ্রহণ করেন।

- তিনি ১৯৬২ সালে ট্রিয়েস্টে অধ্যাপক আব্দুস সালাম আয়োজিত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের উপর অনুষ্ঠিত প্রথম সামার সেমিনার-এ অংশগ্রহণ করেন।

- ১৯৬৩ এবং ১৯৬৪ এই দুই বছর তিনি Institute fur Theoretische Kernphysik, Karlsruhe -এ ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

- তিনি ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই, ১৯৬৮ সালের জানুয়ারী থেকে আগস্ট এবং ১৯৭৪ সালের জানুয়ারী থেকে জুন-এই সময়ে ট্রিয়েস্টের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স (International Centre for Theoretical Physics, Trieste.) -এর ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।

- ১৯৭১ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে (Imperial college of Science and Technology, London.) একজন ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।

- তিনি ট্রিয়েস্টের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স-এর একেবারে প্রথম ব্যাচের একজন এসোসিয়েট হিসেবে এবং পরে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সেখানে একজন সিনিয়র এসোসিয়েট হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৮৫ এবং ১৯৯৩ এই সময়ে তিন মাসের জন্যে ঐ সেন্টারে কর্মরত ছিলেন।

- এছাড়াও তিনি লন্ডন, ভিয়েনা, কিয়েভ, টোকিও, হ্যামবুর্গ, বারি এবং অন্যান্য জায়গার হাই এনার্জি ফিজিক্স কনফারেন্সে (High Energy Physics Conferences in London, Vienna, Kiev, Tokyo, Hamburg, Bari and other places.) যোগদান করেন।

- তিনি ১৯৭৫ সালে আমেরিকার অস্টিনে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সেন্টার ফর পার্টিকেল থিওরিতে (Centre for Particle Theory, Department of Physics, University of Texas in Austin, USA.) একজন ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। - তিনি ১৯৮৫ সালে স্ট্রীং থিওরির উপর এডিনবরা স্কটিশ সামার স্কুলে (Scottish Summer School on String Theory in Edinburgh) অংশগ্রহণ করেন।

- তিনি ১৯৯১ সালে লস এনজেলসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of California in Los Angeles.) ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।

- তিনি ১৯৯৫ সালে ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস ফিজিক্যাল সোসাইটিতে (World Congress of Physical Societies) অংশগ্রহণের জন্য টোকিও যান।

 শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা
trans
অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে দেশে এবং দেশের বাইরে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীদের পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের উপর শিক্ষা দিয়েছেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও এম.এসসি. ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স (Classical Mechanics), কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডিনামিক্স (Quantum Electrodynamics), আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব (Special Theory of Relatvity) এবং ইলেকট্রিসিটি ও ম্যাগনেটিজম (Electricity and Magnetism) ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপর শিক্ষা দিয়েছেন।

ইসলামাবাদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এসসি. ও এম.ফিল. ছাত্র-ছাত্রীদের নিউক্লিয়ার ফিজিক্স (Nuclear Physics), স্ট্যাটিসটিক্যাল ফিজিক্স, ইলেক্ট্রোডিনামিক্স (Statistical Physics, Electrodynamics) এবং সলিড স্টেট ফিজিক্স (Solid State Physics) বিষয়গুলোর উপরে শিক্ষা দিয়েছেন।

এ ছাড়াও তিনি ঢাকা ও ইসলামাবাদে পিএইচডি ও বিভিন্ন গবেষণামুলক কাজে অংশগ্রহণকারী অনেক ছাত্র-ছাত্রীর তত্বাবধায়ক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

 পারিবারিক জীবন
trans
অধ্যাপক ড. রশীদ ১৯৬০ সালে বিদেশ থেকে যখন ঢাকায় আসেন তখন ঢাকা খুব শান্ত। তিনি তখন থাকতেন পুরানা পল্টনে। তার কিছু দূরেই সেগুন বাগিচা। বাবা-মায়ের পছন্দমত তিনি সেগুন বাগিচার মির্জা সিরাজুল হক এবং রাফিয়া মির্জার কন্যা যুথী মির্জার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। যুথী মির্জা তখন ঢাকা বেতারের একজন নামকরা শিল্পী ছিলেন। অবশ্য তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পরপরই তিনি গান করা ছেড়ে দেন।

ড. রশীদ দুই কন্যা সন্তানের জনক। বড় মেয়ে তাহমিনা জয় রশীদ ও ছোট মেয়ে রুখসানা দীপা রশীদ।

 ক্ষেত্রভিত্তিক অবদান
trans
অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান (Mathematical Physics); উচ্চ শক্তির পদার্থবিজ্ঞান (High-Energy Physics); মেসন-এর ফটো প্রোডাকশন (Meson Photo Production); কাইরাল ল্যাগরেনজিয়ান তত্ত্ব (Chiral Lagrangian Theory); উচ্চ সিমেট্রি মডেল (Higher Symmetry Model); রেজ্জে ভেনেজিয়ানো মডেল (Regge Veneziano Model) ইত্যাদি ক্ষেত্রে উচ্চাঙ্গের বৈজ্ঞানিক অবদানের জন্য বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছেন।

 সম্মাননা, স্বীকৃতি ও সংবর্ধনা
trans
অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ তাঁর বিভিন্ন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন :
- শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য জন্য তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত একুশে পদক লাভ করেন।

- তিনি ১৯৯২ সালে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমী অব সায়েন্সেস (Third World Academy of Sciences) -এর ফেলো নির্বাচিত হন।

- তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে "বিজ্ঞান গ্রন্থবর্ষ ২০০৫" উপলক্ষে ভৌতবিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমী প্রদত্ত 'ভৌতবিজ্ঞান শাখা'য় বিজ্ঞান লেখক পদক হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন।

- ১৯৯৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোস প্রফেসর নিযুক্ত হন।

- তিনি ২০০৬ সালের মে মাসে ইউ.জি.সি. প্রফেসর (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অধ্যাপক) হিসেবে নিযুক্ত হন।

 প্রকাশনা ও সৃষ্টিকর্মের বিবরণ
trans
অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের উপর অনেকগুলি বই লিখেছেন। দেশী ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যাও অনেক। এ ছাড়া তাঁর বেশকিছু নিবন্ধপত্র বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণাপত্র

এখানে তাঁর গবেষণাপত্রগুলোর নাম ও প্রকাশকাল উল্লেখ করা হলো:

1. A Field Theory Model for S-wave, K-N Scattering, NUOVO. CIM. 20, 213, 1961 (with B. Bransden and R. Moorhourse) .
2. Elastic Scattering of Pions by Alpha- particles, J. Natur. SC. and Maths. 11, 73, 1962.
3. On the Determination of the Multipoles in Pion Photoproduction by Polarised Photons, NUOV. CIM. 23, 1964
. 4. Regge-Khuri Representation for Photoproduction, NUCL. PHYS. 58, 611, 1964 (with Y.S. Jin).
5. The Effect of the Rho-meson in T=1/2, J=1/2 Pion- Nucleon Scattering Phase Shift, PHYS. LETTS. 10, 151, 1964 (with A. Bohm).
6. On the Resonance Model of Amati and Fubini, INTERNATIONAL CONGRESS OF NUCLEAR PHYSICS, Paris, Vol. 11, 10, 1964.
7. Spin-1 (Meson Photoproduction' PHYS. REV. 140. B1123, 1965, (with M.J. Moravcsik).
8. Photoproduction of the Rho and Omega Mesons from Nucleons, NUCL. PHYS, 87, 306, 1966.
9. One Particle Exchange in Pion Photoproduction, ANN. PHYS (N.Y.) 35, 1069, 1965 (with M.J. Moravcsik).
10. Inelastic Scattering of Electrons from Hydrogen, J. NATUR. SC. AND MATHS. V, 15, 1965 (with F. Faisal)
11. High-energy Pion- Nucleon Charge Exchange Scattering and the Rho-meson Trajectory, NUOV. CIM. 35, 1069, 1965 (with N. Zovko).
12. Electric Charge Form Factor according to SL (6,c) PHYS. REV. LETTS. 17, 275, 1966, (with G. Cocho, C. Fronsdal and R. White).
13. Regge-pole Behaviour in an SL (2,c) Model Field Theory, NUOV. CIM. 47, 1194, 1966 (with G. Cocho).
14. The Algebra of Currents and the Meson Form Factors. PROG. THEOR. PHYS. (Kyoto) 36,1150, 1966 (with G. Cocho).
15. Absorption Correction in High Energy Photoproduction of Pions, NUOV. CIM. 44, 1252, 1966 (with M. Kawaguchi) .
16. Hadron Form Factors according to SL (6,c), ICTP Report, IC/66/84 (with G. Cocho, C. Fronsdal and R. White) .
17. Pion-Nucleon Coupling Constant from Spin- flip Dispersion Relation, ACTA PHYSICA POLONICA 33, 203, 1967 (with M. Islam).
18. Matrix Elements of Operators of Class-1 Representations of SL (n,C), JOURN. MATHS. PHYS. 9,6, 1968 (with C. Fronsdal)
19. Charge Exchange Scattering using SU(3) symmetry and Regge Poles, J. NATUR. SC. AND MATHS. 8, 17, 1968 (with F. Khanam).
20. N (1581) as a Regge- pole and Pion-nucleon Scattering Phase-shift in T=1/2, J=3/2 state, ZEIT. F. PHYSIK 203, 8, 1967 (with B. Basu)
21. K-meson Nucleon Forward Dispersion Relations and the Evaluation of the Coupling Constants, PROG. THEOR. PHYS. (Kyoto) 38, 1338, 1967 (with G. Ara).
22. Some Rotation Functions of Reggeized SU (6), ICTP Report IC/68/39.
23. Meson-Baryon and Baryon-Baryon Scattering in Reggeized U(6)xU(6) Theory, PHYS. REV. 174, 2074, 1968 (with R. Delbourgo)
24. Chiral Dynamics and K14-Form Factors, ZEIT. F. PHYSIK. 230, 65, 1970 (with G. Murtaza).
25. Comparison of Chiral Dynamics With Veneziano, Amplitude for Meson-Meson Systems, NUOV. CIM. LETTS. 2,89, 1969 (with G. Murtaza).
26. Effective Lagrangian and Pion-production pN 2pN, ANN, PHYS. (N.Y.) 56, 222, 1970 (with G. Murtaza).
27. Chiral Lagrangian and Veneziano Models for Scattering and h decay, NUOV. CIM. 64A, 985, 1970.
28. Bootstrap in Two term Veneziano Model with Unitarity, PROG. THEOR. PHYS. (Kyoto) 43,478, 1970.
29. Meson-Baryon Scattering Lengths from SU(3) X SU(3) Chiral Lagrangians, Trieste Report IC/69/84.
30. Elastic Scattering of Law Energy Pions by Alpha Particles. NUCL. PHYS, B17, 189, 1970 (with V.K. Samaranayaka).
31. Non-leptonic hyperon Decays, PHYS. REV. D1, 240, 1070 (with K. Ahmed and G. Murtaza).
32. Saturation of Current Algebra-A Counter Example, Trieste report, IC/69/177 (with C. Frosndal).
33. w3p in the Veneziano Model and the Life- time of the neutral Pion, PHYS. REV. D2, 1970 (with G. Murtaza).
34. The Reaction p p nh with Veneziano Terms, PHYS. REV. D23, 1611, 1971 (with N. Huma).
35. Polarisation in Np Scattering with Ball- Zachariasen Trajectory, AUSTRAL, J. PHYS. 24, 293, 1971 (with Z. Iqbal).
36. Inelastic Meson- Baryon Scattering with Veneziano Model and SU (3) Symmetry, PROG. THEORY. PHYS. (Kyoto) 45, 1143, 1971 (with N. Huma).
37. Broken Chiral and Conformal Symmetry and Kuo Transformation, PHYS. REV. D3, 581, 1971 (with G. Murtaza).
38. Correlations between Al and B decays in Chiral SL(8,c), PHYS. REV. D4, 221, 1971 (with G. Murtaza).
39. Reggeized Symmetry Models and Pion-Nucleon Scattering in Forward and Backward Direction, ANN. PHYS. (N.Y.) 80, 397, 1973.
40. A Test of Vector- Meson Dominance in Reggeized Higher Symmetry Model, ANN. PHYS. (N.Y. O) 80, 425, 1973.
41. Semmetry Breaking and h Decay, PHYS. REV. D7, 913, 1973.
42. The Effect of Neutron Polarizability in Neutron-Electron Scattering, PHYS. LETTS. 42B 111, 1972 (with L. S. Brown)
43. All Photo- production Polarisation Theorems, NUOV. CIM. 15A, 713, 1973.
44. Symmetry Breaking Models for Sigma Term, NUOV. CIM. 17A, 288, 1973.
45. Boundary Curves of the Spectral Functions, D.U. STUDIES 22 (1) 105, 1974.
46. Core Contributions to the Valence Band of KC1-Crystal, D.U. STUDIES B22(2), 21, 1974 (with S. M. Mujibur Rahman and S.M.M.R. Chowdhury).
47. Energy Band Structure Calculation of KC1 in Crystalline State, NUOV. CIM. 25B, 803, 1975 (with S. M. Mujibur Rahman and S.M.M.R. Chowdhury).
48. A Mixed Approach Using LCAO and OPW for energy - band calculations of Alkali-Halide Crystals, PHYS. REV. B14, 2613 (1976) (with S. M. Mujibur Rahman and S.M.M.R. Chowdhury).
49. Deep Inelastic Electron Scattering in a Reggeized Symmetry Model, Journal of Bangladesh Academy of Sciences, Vol. 1, p.1. 1977.
50. A Simple Derivation of Schwinger's Sum Rule, NUOV. CIM. (1976), 33A, 447.
51. Relativistic Greens Function Method for Crystal Films and Surfaces, Dhaka University Studies B24.
52. Regge Phenomenology with Symmetry Schemes, Nucl. Sci. and Appl, B. Suppl., p. 68, 1977.
53. Meson - Baryon Scattering Lengths, PHYS. REV. D1, JULY, 1977 (with Kh. Muttalib).
54. Nucleon Polarisabilities from the Isobar Model, J. Bangl. Acad. Sc., Vol. 2, 1, 1978.
55. Charmonium Spectroscopy By Variation Method, Dhaka University Studies B27, 39, 1978 (with M. Munirul Islam) .
56. Saturation of Schwinger Sum rules for Spin- Dependent Structure Functions, Dhaka University Studies B, 27, 25, 1979 (with T. K. Chaudhury)
57. Determination of the Arbitrary Parameters in Resonance Couplings, Dhaka University Studies B, 27, 7, 1979 (with Kh. A. Muttalib).
58. Chiral Lagrangian Method and its application, Proc. of the Physics Symposium, Jan., 1979 published by the Bangladesh Physical Society, Dhaka.
59. Bose-Fermi Supersymmetry in graded Lie Algebra, J. Bangladesh Math. Soc. 1, 7, 1981.
60. Photoproduction in the Isobar Model Revisited, J. Bangl. Acad. of Sc., 4, 91, 1980.
61. Effect of Two-Pion Exchange in Nucleon- Nucleon Scattering in High Partial Waves, International Centre for Theoretical Physics, IC/83/4 (with T. K. Chaudhury).
62. Low Energy proton Compton Scattering, International Centre for Theoretical Physics, IC/83/4 (with T. K. Chaudhury).
63. On the Electromagnetic Polarisabilities of the Nucleon, International Centre for Theoretical Physics, IC/82/210.
64. Introduction to String Theories-Proc. fo the International Conference on Mathematical Physics, University of Chittagong, January 8-10, 1986.
65. Lectures on Salam- Weinberg Theory and QCD, at the Centre for Mathematical Sciences of the University of Chittagong. 12-19 March 1988.
66. On the Calculation of the Static Properties of the Nucleon From the Skyrme Model, (with Sk. Nurul Alam), International Bose Symposium, 11-14 December, 1988.
67. Calculation of spin observables in Nucleon- Nucleus Scattering at Medium Energies, (with S. M. Inteshar H. Masud), International Bose Symposium, 11-14 December 1988.
68. Meson-Meson Scattering from Chiral Lagriangian of Pseudoscalar and Vector Mesons, (with Arshad Momen), International Bose Symposium, 11-14 December 1988.
69. Nucleon-Nucleus Scattering from Dirac Equation, International Bose Symposium, 11-14 December 1988.
70. On the Skyrme Model, International Conference of Mathematical Physics at Chittagong University, January, 1988.
71. Rotating solitons in General Relativity, (with M. Arshad Momen), Bangl. J. Acad. Sc. 15, 199, 1991.
72. Topological Field Theories, International Physics Seminar, 1990.
73. Stability of a System of Uncharged Bosons in Screened Coulomb and Linear Potentials, (with Najma Ahmed) Bangl. J. Acad. Sc. 16, 141, 1992.
74. W+W-Pair Production in e+e- collision, (with S. I. Khandaker), Bangl. J. Acad. Sc. 16, 207, 1992.
75. Three-D Singletons and 1-D C.F.T., (with C. Fronsdal and M. Flato) Into. J. Mod. Phys. 7, 2193, 1992.
76. Non-Standard Model Couplings in WWV vertex, (with Kh. Saiful Islam), In. J. Mod. Phys. A 9 (1994)2783.
77. The reaction e+g=W+n using axial guage" (with Khairul Alam), Journal of Japan Physical Society, February 1996.
78. Electromagnetic Penguin Diagram (with Naima Naheed), J. Bangl. Acad. Sc. (1999).
79. Inastic Photoproduction of W-Boson (with Khairul Alam), Mod. Phys. Letts. A, 13,
80. Meeting Points of Mathematics and Physics ; Operator Algebras and Inflationary Universe; A. M. Harun ar Rashid, Proc. Int. Con. on Applied Mathematics, 2002, Dept. of Mathematics, Shahjalal University of Science and Technology, Sylhet, Banglad
esh, p-3

81. Entanglement and the Conceptual Basis of Quantum Mechanics; A. M. Harun ar Rashid, Proc. Int. Con. on Applied Maths, 2004, Dept. of Mathematics, Shahjalal University of Science and Technology, Sylhet, Bangladesh, p-19
82. Quark mass matrices and their implications in the CKM Matrix phenomenology; A. M. H. Rashid and I. M. Syed, Proc, Mini-Workshop on Applied Maths., 1998, Dept. of Maths., Shahjalal University of Science and Technology, Sylhet, Bangladesh, p-191
83. Pursuit and Promotion of Science, A. M. Harun ar Rashid, Bangladesh in the New Millenium, p-289 ed. Abul Kalam, University of Dhaka, UPL Ltd., Also published in Our Alma Mater, Dhaka Physics Group
84. From a Vision to a System, ed. A. M. Hamende p- 252 Int. Foundation Triest for the Progress and the Freedom of Science, Italy. Also in Italian.
85. Flavour Changing Electromagnetic Vertex in Rose B-meson Decays; A. M. Harun ar Rashid, Bangladesh Journal of Physics, 2(1) (2006), p. 1-13.

 বইসমূহ
trans
অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদের বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা বইগুলোর নাম, প্রকাশকাল ও প্রকাশনা সংস্থার নাম উল্লেখ করা হলো :

  1. Nuclear Structure (with A. Hossain and M. Islam); 1967; North Holland, Amsterdam

  2. আইনস্টাইন ও আপেক্ষিক তত্ত্ব; 1984 Bangla Academy

  3. বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান (বাংলা একাডেমী বক্তৃতা); 1985; Bangla Academy

  4. পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব; 1987; Bangla Academy

  5. Quantum Mechanics; 1988; University of Dhaka

  6. কম্পিউটারের কাহিনী; 1988; Ahmed Publication

  7. চিরায়ত বলবিজ্ঞান; 1990; Bangla Academy

  8. বিজ্ঞান ও দর্শন; 1991; Bangla Academy

  9. গ্ল্যাসো-সলাম-ভাইনবার্গ তত্ত্ব; 1992; University of Dhaka

  10. চিরায়ত বিদ্যুত বলবিজ্ঞান; 1992; Bangla Academy

  11. উপমহাদেশের কয়েকজন বিজ্ঞানী; 1992; Jiggasha

  12. বস্তুর সাধারণ ধর্ম; 1993; Bangla Academy

  13. Satyen Bose in Dhaka; 1994; University of Dhaka

  14. আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের কয়েকজন স্রষ্টা; 1995; Bangla Academy

  15. সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব ও বিশ্বসৃষ্টি; 1996; University of Dhaka

  16. জগদীশ চন্দ্রের পত্রাবলী; 1998; Bangla Academy

  17. Complex Variable and Special Functions of Mathematical Physics; 1999; University of Dhaka

  18. Geometrical Methods in Physics; 2000; University of Dhaka

  19. ঘুরে ফিরে দেখা আমাদের মহাবিশ্ব; Shahitya Publication

  20. মৌলিক কণা; Bangla Academy

  21. পরিসংখ্যান বলবিজ্ঞান; Bangla Academy

  22. গ্রুপ তত্ত্ব ও পরিসংখ্যানে এর প্রয়োগ; 2002; Bangla Academy

  23. বিদ্যুত্‍ ও চুম্বক তত্ত্ব

  24. আধুনিক নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান; 2003; Bangla Academy

  25. Bangladesh Vision-2021; Bangladesh Academy of Sciences (ed.)

  26. Second National Symposium on Science and Technologies (ed.); Bangladesh Academy of Sciences (ed.)

  27. Introduction to Particle Physics (with Arshad Momen)

  28. Quantum Field Theory (with Arshad Momen)

  29. আকাশ-ভরা সূর্য-তারা; 1988; Ahmed Publication

নিবন্ধপত্র (Review papers ) :

1. Resonances in Elementary Particles, Nucleus 2, 23, 1963
2. Strong Interactions at High Energies, Nucl. Sc. & Appl. (Dhaka) 1, 48, 1965.
3. Unitary Symmetries, ibid 1, 66, 1965, Pakistan Observer,
4. Nobel-Prize in Physics for 1965, Pakistan Observer, October 30, 1965.
5. International Seminar on low-energy Nuclear Physics, ibid January 15, 1967.
6. High Energy Physics Conference at Kiev, ibid, November 19, 1970.
7. Grand Unification Theory, The Physicist, Bulletin of the Bangladesh Physical Society (1971).
8. High Temperature Superconductivity, The Physicist, (1988).

 সর্বোচ্চ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কাজের বিবরণ ও মূল্যায়ন
trans
অধ্যাপক হারুন অর রশীদের নিম্নলিখিত গবেষণা কর্ম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও প্রশংসিত হয়েছে :

ক) গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান (Mathematical Physics);
খ) উচ্চ শক্তির পদার্থবিজ্ঞান (High- Energy Physics);
গ) মেসন-এর ফটো প্রোডাকশন (Meson Photo Production);
ঘ) কাইরাল ল্যাগরেনজিয়ান তত্ত্ব (Chiral Lagrangian Theory);
ঙ) উচ্চ সিমেট্রি মডেল (Higher Symmetry Model);
চ) রেজ্জে ভেনেজিয়ানো মডেল (Regge Veneziano Model).

 সমকালীন রচনা
trans
২০০৩ সালে বাংলা একাডেমী থেকে অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদের লেখা সর্বশেষ বই "আধুনিক নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান" প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৬ সালে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সৃষ্টির শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা ফিজিক্স গ্রুপ (Dhaka Physics Group) থেকে তাঁর সম্পাদনায় "আওয়ার আলমা মেটার, ফ্রম বোস-আইনস্টাইন টু সালাম-ভাইনবার্গ এন্ড বিয়ন্ড" (Our Alma Mater, From Bose-Einstein to Salam- Weinberg & Beyond) বইটি প্রকাশিত হয়।

 সুহূদদের মন্তব্য
trans
অধ্যাপক হারুন অর রশীদকে নিয়ে তাঁর সুহৃদদের শুভেচ্ছার শেষ নেই৷ তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, পারমাণবিক শক্তি, কেন্দ্রের প্রাক্তন পরিচালক এবং সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ (Centre of Excellence for Scientific Research) এর প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ড. আমীর হোসেন খান বলেন, 'বিজ্ঞানের অনেক জটিল বিষয় নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তাঁর মধ্যে সবসময়ই সচেতনতা আর কাজের প্রতি একাগ্রচিত্ততা ও যত্নশীলতা বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। বাংলাদেশের স্বল্প সংখ্যক বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর মধ্যে তিনি অন্যতম। নোবেল লরিয়েটসহ বিশ্বের বিভিন্ন উঁচু মানের বিজ্ঞানীদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বাংলাদেশের, বিশেষ করে পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছে।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. সিরাজুল হক বলেন, 'তাঁর অনুজদেরকে তিনি সবসময় ভালো কাজের জন্য উত্‍সাহ দেন, শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে খুব শক্ত করে সত্য পথের হাল ধরে থাকতে বলেন। সাধারণ চোখে তাঁকে দেখলে হয়ত খুব কঠিন মানুষ বলে মনে হয়- যা কোনো নবীন ছাত্রের মনে ভীতি উদ্রেক করার মতো, কিন্তু কাছে এসে, একসাথে কাজ করার সুযোগ হলে তাঁকে বুঝতে পারা যায়। তাঁর মধ্যে স্নেহ-শীতল কোমলতা খুঁজে পাওয়া যায়। কিছু বিরতিসহ আমরা প্রায় ১৩ বছর একসঙ্গে বাংলা একাডেমীর বিজ্ঞান বিশ্বকোষ নিয়ে কাজ করেছি, কাজ করার সময় আমার এই ধারণা হয়েছে।'

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সময় আমি তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয় তিনি একজন অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। একজন সত্যিকারের শিক্ষক বলতে যা বুঝায় স্যারের মধ্যে আমি তার সব বৈশিষ্ট্যই খুঁজে পেয়েছি। তিনি আমাদের দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী। মানুষ হিসেবে তিনি অনেক উঁচু ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি আমার খুব প্রিয় একজন শিক্ষক এবং স্যারকে দেখেই আমি শিক্ষকতার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছি।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আরশাদ মোমেন বলেন, 'অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ বাংলাদেশের তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম পথিকৃত। নিয়মিত গবেষণার পাশাপাশি তিনি পদার্থ বিজ্ঞান শিক্ষায় বিশেষ করে বাংলা ভাষায় পদার্থ বিজ্ঞান শিক্ষায় এক অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন। ব্যক্তিগত ভাবে তিনি শুধু আমার শিক্ষকই নন, পাশাপাশি তিনি আমার পিতৃতুল্য। তাঁর কাছে পদার্থ বিজ্ঞান ও গণিতের পাশাপাশি আমি একজন সমপূর্ণ মানুষ হওয়ার উপাদানগুলো সমপর্কে জেনেছি। এখনও মনে হয় তাঁর কাছে আমার অনেক কিছুই শেখার বাকি আছে।'

 শেষকথা
trans
পদার্থ বিজ্ঞানের গবেষণা দিয়ে অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন-অর-রশিদ যে জীবন গড়েছেন এখনও সেই জীবনকেই তিনি বয়ে চলেছেন। জীবনে তিনি অনেক দেশের অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানীর সাথে গবেষণা করেছেন, জ্ঞান লাভ করেছেন। সবসময় নিজের ভেতর সততা, মহত্ত্ব, ন্যায়পরায়ণতা, বিচক্ষণতা আর দেশপ্রেমকে ধারণ করেছেন। এইসব সঞ্চয় দিয়েই তিনি তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে অসংখ্য কৃতি শিক্ষার্থী সৃষ্টি করেছেন-যাঁরা দেশে, বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় গবেষণা কর্মে যুক্ত থেকে তাঁদের শিক্ষকের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে তিনিও তাই গর্ববোধ করেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের কথা জানতে চাইলে বলছিলেন, 'আমি মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে, তিনি আমাকে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী উপহার দিয়েছেন।' বর্তমান সময়েও তিনি পদার্থ বিজ্ঞানের এম. এস. ব্যাচের ছাত্রদের পড়াচ্ছেন। আর থেমে নেই তাঁর গবেষণাও। এখন তিনি Quantum Field Theory নামে একটি বই লেখার কাজ করছেন। ড. রশীদ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার আশা করেন।

সত্তরোর্দ্ধ এই পদার্থ বিজ্ঞানী তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন খুব ভালো আছেন। অবসরে বই পড়েন, মাঝে মাঝে শোনা হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং বেটোফেন আর মোত্‍সার্টের অনবদ্য সেই সৃষ্টিগুলো। তবে ২০০৬ সালের মে মাসে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর থেকে যেন একটু ক্লান্তি বোধ করছেন তিনি। একটানা অনেকক্ষণ কথা বললে একটু যেন হাঁপিয়ে ওঠেন। ডাক্তারের পরামর্শ মতো তাই একটু দেখে শুনে চলতে হয়। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যে আদর্শ আর সততার পথে চলা শুরু করে আজ এতদূর পর্যন্ত এসেছেন, জীবনের বাকি পথটুকুও তিনি সেই সততা আর আদর্শকে সঙ্গে নিয়েই চলতে চান।

 অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ এর একটি সাক্ষাত্‍কার
trans
প্রশ্ন: কর্মজীবনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে গিয়ে আপনার যেসব অভিজ্ঞতা হয়েছে তার মধ্যে থেকে মজার কোনো অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

ড. রশীদ: কর্মজীবনে কাজ করতে গিয়ে আমার উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো মজার অভিজ্ঞতা হয়নি।

প্রশ্ন: অধ্যাপক আব্দুস সালামের সাথে আপনার প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

ড. রশীদ: ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেওয়ার পরে আমি যখন দেশে ফিরছিলাম তখন আব্দুস সালামের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। আমি তাঁকে লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে দেখতে গিয়েছিলাম, সেখানে তিনি অল্প কয়েক মাস আগে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত সদয় ছিলেন, আমার কাজের ব্যাপারে জানতে চাইলেন, আমাকে তাঁর সহযোগী পল ম্যাথিউস -এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, এবং আমরা একসাথে কুইন্স গেটের একটি ভবনের নিচতলায় মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য গেলাম। এই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতের দশ বছর পর ১৯৭১ সালে আমি আবার ইমপেরিয়েল কলেজে ভিজিটিং প্রফেসর হয়ে গিয়েছিলাম এবং যেদিন আমি লন্ডন ত্যাগ করছিলাম, সেদিন তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আমাকে লন্ডনের গ্লস্টার রোড আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের সাথে একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চের নেমন্তন্ন করলেন। সেইসময় আমরা অনেকক্ষণ ধরে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলেছিলাম এবং আমি তাঁর মধ্যে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলাম- ভালোবাসার যোগ্য, দয়ালু, সহানুভুতিশীল এবং আমাদের দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী কিছু করার ইচ্ছায় অত্যন্ত উদগ্রীব। আই.সি.টি.পি. এবং থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমী অব সায়েন্স (Third World Academy of Sciences) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তাঁর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করেন।

প্রশ্ন: আই.সি.টি.পি. সম্বন্ধে একটি বইয়ে আপনি লিখেছেন It is no exaggeration to say that this Centre is our only window into the scientific progress of the twentieth century (and hopefully the twenty-first) and without this centre, there would have been little or no science in many Third World countries like Bangladesh . এখানে আপনি বলছেন যে, এটা না থাকলে বাংলাদেশের মতো কিছু দেশে সায়েন্স বা বিজ্ঞান থাকতো না। প্রশ্ন হচ্ছে এই আই.সি.টি.পি. কিভাবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সায়েন্সের উন্নয়নে ভুমিকা রাখছে?

ড. রশীদ: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। আই.সি.টি.পি.তে প্রতিবছর বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশের মতো আরও অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা এসে তাঁদের উদ্ভাবন, তাঁদের নতুন নতুন পরিকল্পনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। ঐসব আলোচনায় উপস্থিত থাকার মাধ্যমে অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীরা অনেক কিছু জানতে পারছে, যা তাঁর বা তাঁদের দেশের বিজ্ঞনের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ সম্বন্ধে অধ্যাপক আব্দুস সালামের মনোভাব কেমন ছিল বলে আপনি মনে করেন?

ড. রশীদ: তিনি বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন এবং তাঁর উত্‍সাহ এবং সহযোগিতার কারণেই অনেক বাঙালী বিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রশ্ন: বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ডিরাক এবং হাইসেনবার্গের সঙ্গে আপনার সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

ড. রশীদ: এই দুজনকেই আমি ট্রিয়েস্টে বক্তৃতা দিতে শুনেছি, হাইসেনবার্গকে একবার এবং ডিরাককে অন্তত দুইবার। তাঁদের মতো অমায়িক, সহূদয় পদার্থবিজ্ঞানীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারা আমার জীবনের একটা বড় অভিজ্ঞতা। তাঁদের ছাড়াও আমি পরে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সুইংগারের (Schwinger) সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছিলাম। তাঁদের কাছ থেকে আমি যে প্রেরণা পেয়েছি তা আমার জীবনে পাথেয় বলেই আমি মনে করি।

প্রশ্ন: সত্যেন বোসের সাথে আপনার যখন প্রথম সাক্ষাত্‍ হয়েছিলো তখন আপনাদের মধ্যে কী বিষয় নিয়ে কথা হয়েছিলো?

ড. রশীদ: সত্যেন বোসের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো এক সন্ধ্যায় কলকাতার রাজভবনে। সেই সময় তাঁর ৮০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান চলছিল, সেই আয়োজনে আমন্ত্রণ পেয়েই আমি গিয়েছিলাম। তিনি একটা সোফায় বসে ছিলেন, আমি তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। সেদিন অনেকক্ষণ ধরে তাঁর সাথে আমার কথা হয়। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম কোয়ান্টাম সংখ্যাতত্ত্বের যে সূত্রটা আপনি নির্ধারণ করলেন সেটার সমাধান আপনার মনে কিভাবে এলো। তিনি আমাকে বললেন, 'দেখ্, তোদের ওখানে আমি যে পড়াতাম রে'- তাঁর ভাষায় বলছি, তিনি আমাকে তুই করে বলতেন। আসলে ঐ বিষয়টা তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন আর পড়ানোর সময়ই তাঁর মনে হয়েছে যে এ বিষয়ে প্ল্যাংকের নির্ধারণের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানে সেই সময় প্রত্যেক মৌলিক কণার কণা এবং তরঙ্গ উভয় ধর্মকেই বিবেচনা করা হতো যাকে বলা হতো ওয়েভ পার্টিকেল ডুয়ালিটি। প্ল্যাংক তাঁর নির্ধারণে মৌলিক কণার কণা ও তরঙ্গ উভয় ধর্মকেই বিবেচনায় নিয়ে একটি সূত্র প্রতিপাদন করেন। এই সূত্র ছাত্রদের পড়ানোর সময় সত্যেন বোসের মনে হয়েছে, শুধু কণা ধর্ম বিবেচনা করেও একটা নির্ধারণ বের করা সম্ভব। আমি তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে প্ল্যাংক বা অন্য কারো বিষয়টি চোখে পড়েছিলো কি না। তিনি বললেন যে আসলে প্ল্যাংক, আইনস্টাইন এবং আরও অনেকেই এরকম একটা নির্ধারণ বের করার জন্যে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যেন বোসই কণা নির্ভর সঠিক নির্ধারণটি বের করেন।

প্রশ্ন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ আমাদের দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান লেখাপড়া ও গবেষণার মান নিয়ে মন্তব্য করুন।

ড. রশিদ : আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান লেখাপড়া মোটামুটি ভালো, তবে সবক্ষেত্রে যে খুবই উন্নত মানের তা হয়তো বলা যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের লেখাপড়া ও গবেষণার ঐতিহ্য বহুদিনের এবং এই বিভাগের শিক্ষকদের গবেষণা প্রবন্ধ এখনও নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়ে থাকে; সংখ্যায় হয়ত প্রকাশনার পরিমাণ খুব উল্লেখযোগ্য নয়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকায়, তবুও নিতান্ত কম বলেও আমি মনে করি না।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনো বিশেষ স্মৃতি যদি মনে থাকে তাহলে সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

ড. রশীদ: আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন আমি পরিবার নিয়ে লন্ডনে চলে গিয়েছিলাম। যাওয়ার আগে মাকে বলে গিয়েছলাম যে দেশ যদি পাকিস্তান থাকে তাহলে আমি আর ফিরে আসবো না। লন্ডনে আমি তখন ইমপেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে ছিলাম।

প্রশ্ন : আপনার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনার কথা বলুন।

ড. রশিদ : আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ১৯৫২ সালের ২১শে ও ২২শে ফেব্র্রুয়ারী। এর আগের দিন, মানে ২০শে ফেব্রুয়ারী আমরা ছাত্ররা আলোচনা করে ঠিক করলাম যে পরের দিন আমতলায় মিটিং হবে, সেখানে আমরা সবাই থাকবো এবং যেহেতু আগের দিন আমরা শুনলাম যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, আমাদের ছাত্রদের মধ্যে ঠিক হলো যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে এই ১৪৪ ধারা ভাঙবো। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এখন যেটা ঢাকা মেডিকেল কলেজ তার ঐ পাশটা মানে ট্রেন লাইনের দিকটা, ওখানে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ ছিল। আমরা অনেক ছেলেমেয়ে ঐ আমতলায় জড়ো হলাম। গাজীউল হক ঐ সময় বেশ নামকরা ছাত্রনেতা ছিলেন। সবাই মাঠে গিয়ে ওনাকেই বললাম যে আপনি স্টেজে ওঠেন। তারপরে আমার মনে আছে গাজী ভাইয়ের বক্তৃতা শুরু হলো, আমি তার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার আগে আওয়ামী লীগের শামসুল হক সাহেব এসে বক্তৃতা দিলেন যে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা ঠিক হবে না। কিন্তু আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা বললাম-না এ সিদ্ধান্ত আমরা মানবো না, আমরা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে যাবোই। যাঁরা নেতা গোছের তাঁরা বোধ হয় আঁচ করেছিলেন কী হবে, তারা যেতে চাচ্ছেন না- খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মনোভাব অন্যরকম। তারপর গাজীকে দাঁড় করিয়ে দিলাম, গাজী বক্তৃতা দিলো। উনিই বললেন যে আপনারা পাঁচজন-পাঁচজন করে গেট দিয়ে বেরোবেন। তারপরে ঐ যে জগন্নাথ হলের অ্যাসেম্বলি হাউজ, ওইখানে তখন পূর্ববাংলার লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির মিটিং হচ্ছিলো, নূরুল আমিন সরকারের নেতারা সেখানে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রেও তো মুসলিম লীগ সরকার। কারো বাংলা ভাষা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। কাজেই আমরা ছাত্ররা ঐ গাজী ভাইয়ের কথামতো পাঁচজন-পাঁচজন করে ঐ গেট দিয়ে বের হলাম। প্রথম দিকে বের হইনি, কিছুক্ষণ পরে যখন অনেকে বের হয়ে গেছে তখন আমিও বের হয়ে গেলাম। আমার সঙ্গে আরও চারজন ছিল। আমার মনে আছে আমি যখন বেরিয়ে একটু সামনে গিয়েছি তখন এক পুলিশ এসে আমাকে টান দিয়ে ধরে একটা বাস দাঁড়িয়ে ছিল, তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল-'যাও'। আমি উঠলাম কিন্তু কিছুক্ষণ পরে পুলিশটি চলে গেলে আমি বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে মেডিকেল কলেজের দিকে যাচ্ছি। যাওয়ার সময় সেখানে তার একটু আগে পুলিশ লাঠিচার্জ করছিল-বেদম লাঠিচার্জ। আমি তখন মার খাইনি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে বেরুনোর সময় কিছুটা খেয়েছিলাম। আমি তখন ভয় পেয়ে রাস্তার ধারে যে নর্দমা ছিল সেখানে গিয়ে লাফ দিয়ে পড়লাম। আমার পরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির এক মহিলা- উনিও লাফ দিয়ে পড়লেন আমার পাশে। আমি ওনাকে বললাম, 'ভয় পাবেন না, আপনার কিছু হবে না।' পুলিশ লাঠিচার্জ করে চলে গেলে আমি ওনাকে টেনে তুলে বললাম, 'আপনি বাসায় চলে যান'। উনি তখন আমার কথামতো বাসায় চলে গেলেন।

তারপরে আমি ওখান থেকে হাঁটা শুরু করলাম। এখন যেখানে শহীদ মিনার-ওখানে শনের ছাউনি দেওয়া কিছু কাঁচা দোকান ছিল। সেই দোকানগুলোতে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হতো, ছাত্র-ছাত্রীরাই খেতো। সেখানে মাটির বিরাট বিরাট জালায় পানিও ছিল। ওখানে যখন পৌঁছেছি পুলিশ এসে আবার আমাদের উপর লাঠিচার্জ করলো। পুলিশ কোনদিক থেকে এলো তাও আমার খেয়াল আছে। ইউনিভার্সিটির দিক থেকে মানে কার্জন হলের দিক থেকে এসে পুলিশ আমাদের উপর টিয়ার গ্যাস ছাড়লো। তারপর আমরা গিয়ে ঐ ঘরগুলোতে ঢুকলাম এবং আমার এখনও মনে আছে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা স্কুল থেকে সব দল বেঁধে এসেছে, কারা ওদের স্কুল থেকে নিয়ে এসেছে তাও জানি, হয়তো তারা একটা ভালো কাজই করেছিল। ওরাও টিয়ার গ্যাস খেলো। টিয়ার গ্যাস খেয়ে বেচারা ছোট ছোট বাচ্চাগুলি, এমনভাবে তাদের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, কাঁদছে না, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে- ঐ রকম কয়েকটা মেয়ে এসে ঐ ঘরে ঢুকছে। আমি তখন তাড়াতাড়ি জালা থেকে পানি বার করে রুমালটা ভিজিয়ে দিয়ে বললাম- 'নাও, চোখ মোছো।' তারপরে ওরা একটু সুস্থ হলে আমি বললাম, 'তোমরা এখন চলে যাও বাসায়, এখানে থেকো না।' আমার এখনও মনে আছে এক মেয়ে বললো- 'না আমরা যাবো না, আমরা আপনাদের সাথে থাকবো।' আমি এখনও মেয়েটার মুখটা মনে করতে পারি, কী রকম সাহসী মেয়ে। কী বলবো, কিছু না বলে চলে গেলাম। ওরা বোধ হয় তখনও ছিল, অনেক পরেও ছিল।

তখন আমি গেলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের এখন যেখানে শহীদ মিনার তার ঠিক পিছনে, ঠিক পিছনে কয়েকটা ব্যারাক ছিল, এখন ওখানে বিল্ডিং হয়েছে। তখন অবস্থাটা একটা ঝড়ের আগে শান্ত হওয়ার মতো অবস্থা। পুলিশ-টুলিশ কিছু নেই, আগে সামনেই পুলিশ ছিল, এখন তারাও নেই। আমি হাঁটছি, একটু সামনের দিকে যেতেই হঠাত্‍ শুনলাম গুলির শব্দ। প্রথমে বুঝিনি, কোনোদিন তো শুনিনি গুলির শব্দ। কিছুক্ষণ পরে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেলো। একটু পরেই কতকগুলো পুলিশ গেটের মধ্যে ঢুকে ইট দিয়ে ছাত্রদের মারা শুরু করলো। কিছুক্ষণ মারার পরে তারা আবার চলে গেলো। এই আমার চোখে দেখা। এর কিছুক্ষণ পরেই আমাদের ছাত্রদের মুখে শুনলাম যে, গুলি হয়েছে এবং বেশ কিছু ছাত্র মারা গেছে। তারপর আমি দেখছি ওখানে মেডিকেল কলেজের গেট আর ছাত্রাবাসের গেটের মধ্যে একটা দেয়াল ছিল, ঐ দেয়ালটা ছাত্ররাই ভেঙ্গে ফেললো। দেখলাম ঐ যারা আহত, আহত না মৃত, তাদের ডেড বডি একেকজন করে নিয়ে এলো। একেবারে এমনভাবে গুলি লেগেছে, রক্তে সমস্ত ভেসে যাচ্ছে। অন্য একজন গামছা বা চাদর কি একটা দিয়েছিল, সেটাও রক্তে ভেসে যাচ্ছে। একজনকে কোনোভাবে নিয়ে যাওয়া হলো, সেও বোধ হয় শেষপর্যন্ত বাঁচেনি। তারপরে হাসপাতালে গিয়ে শুনলাম বেশ কয়েকজন মারা পড়েছে, তাদের মর্গে রাখা হয়েছে। আমি সেখানে গেলাম, মর্গে। মর্গে গিয়ে যা দেখলাম সে দৃশ্য আমি জীবনে কোনোদিন ভুলতে পারবো না। দেখলাম একজনের ডেড বডি রাখা হয়েছে, আরও তিন জনের আছের যে ডেড বডি আমার সবচেয়ে চোখে পড়লো তার মাথার খুলি সম্পূর্ণ স্ম্যাশ্ড্, আর ঘিলু-টিলু সমস্ত চতুর্দিকে ছিটিয়ে আছে। তার পায়ের জুতা-এই জুতা আমার এখনও চোখে ভাসে। ডেড বডি শুয়ে আছে তো তাই জুতাটাই প্রথমে চোখে পড়ে। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম, দাঁড়িয়ে একদম স্তম্ভিত হয়ে গেছি, মনে মনে ভাবছি যে, এই হলো আমাদের স্বাধীনতা। ওখানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপরে আমি আস্তে আস্তে হেঁটে চলে এলাম। এখন যেখানে মেডিকেল কলেজের বাগানটা আছে তার একটু দূরে মানে ছাত্রাবাস থেকে একটু দূরে যে মেইন গেটটা আছে সেখানে গিয়ে ঢুকলাম। তখন ঐ দৃশ্য দেখার পরে আমার আর হাঁটার শক্তি ছিল না। আমি বসে পড়লাম। চুপচাপ বসে আছি, কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে আমার আর কিছু মনে নেই। আমার বন্ধুদের মুখে পরে শুনেছি যে ওরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে কোথাও না পেয়ে ভেবেছে আমিও বোধ হয় ওয়ান অব দ্য কিল্ড।

ওখানে বসে থেকে প্রায় সন্ধ্যা আটটায় বাসায় চলে এলাম, বাসা কাছেই ছিল। বাসায় আসার পরে শুনলাম পরের দিন মানে ২২শে ফেব্র্রুয়ারি ওখানে জানাজা হবে, ছাত্র-ছাত্রীদের আসতে বলা হলো। আমি সকালবেলা ওখানে যাওয়ার জন্যে বাসা থেকে বেরুচ্ছিলাম। আমার মা বললেন- 'হারুন, তুই যাস না।' আমি বললাম, 'মা আজকে মানা করে কিছু করতে পারবে না। আমাকে আজকে যেতেই হবে। যদি মারা যাই, মনে কোরো মা তোমার ছেলে মারা গেছে। আমি না গিয়ে পারবো না।' মা আমাকে কিছু না বলে মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

প্রচুর লোক হয়েছিল জানাজায়, কতো লোক হয়েছিল তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। জানাজা হলো। জানাজার পরে এনাউন্স করা হলো যে আমরা মিছিল করে আবার নবাবাপুরের দিকে যাবো। সে মিছিলে আমি ছিলাম। মিছিলের মাথাটা যখন সবে নবাবপুরে চলে গেছে তখনো আমরা, শেষের অংশটা, এই মেডিকেল কলেজ থেকে বেরোচ্ছে; কতো লোক ছিল সেটা বোঝানোর জন্যে তোমাকে বলছি, অসংখ্য লোক এবং সমস্ত ঢাকা শহরের লোক তখন ঐ মিছিলে যাওয়ার জন্য হাজির হয়েছে। এই পুরান ঢাকা থেকে এসে সমস্ত লোক মিছিলে যাচ্ছে। সেই দৃশ্য ভোলার মতো না। তা আমি যখন ঐ মিছিলে কার্জন হলের সামনে এসে হাজির হয়েছি তখন আমার চোখে পড়লো পাশে যে হাইকোর্ট, হাইকোর্টে তখন কিছু পাকিস্তানি সৈন্যরা থাকতো। আমি দূর থেকে দেখছি তাদের কিছু লোক গেট দিয়ে বেরোচ্ছে, আন্ডার সাম কমান্ড তারা লেফট-রাইট করে বেরোচ্ছে। তখনই আমি বুঝেছি যে এরা তো আর মজা করতে বেরোচ্ছে না, এরা কিছু করবে। আমিতো সন্ত্রস্ত হয়ে গেছি। দেখলাম ঠিকই, বেরোল, এখন যেখানে শিক্ষা ভবন আছে, ওখানে যে বাগানটা আছে, ওখানে ওরা হাজির হলো। ওরা বোধ হয় বালুচ সৈন্য ছিল, পাকিস্তানি আর্মির ফুল ড্রেস পরা। ওদের কমান্ডার ওখানে এসে টেক পজিশন না কী একটা বললো আল্লাই জানে, ওরা সবাই দাঁড়িয়ে গেল। দাঁড়িয়ে ওদের অর্ডার অনুসারে বন্দুক উঠালো। আমি তখন মাঝামাঝি; ওদের বন্দুক উঠানো দেখেই আমি বুঝলাম এবার বোধ হয় শেষ। বন্দুক উঠাচ্ছে দেখেই আমি দৌড়ে গিয়ে রেলিং টোপকিয়ে হাইকোর্টের মধ্যে ঢুকলাম। হাইকোর্টের দিকে একটা গুলি হয়েছে এবং একজন আমাকে বললো যে একজন শহীদ হয়েছে। আমি দেখলাম হাইকোর্টের মধ্যে তো সেফ না, ওখানেও তো ওরা আসতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি কোনো রকমে রেলিং টোপকিয়ে আবার কার্জন হলে এসে পড়লাম। কার্জন হল হলো আমাদের এলাকা, এখানে আমাকে কে কী করবে। দেখলাম এখানে আরও অনেকে আছে। সবাই বললো যে একজন শহীদ হয়েছে তার গায়ের শার্টটা একজন নিয়ে এসে রেলিংয়ের উপরে টাঙিয়ে দিয়েছে।

মিছিল তখন ভেঙ্গে গেছে, যে যেদিকে পেরেছে দৌড় দিয়েছে। আমিও তখন তাড়াতাড়ি করে বাসায় চলে গেলামর এই ঘটনার পরে জাস্টিস এলিস নামে এক ইংরেজ জজের সভাপতিত্বে একটা এনকোয়ারি কমিশন গঠন করা হলো। উদ্দেশ্য ছিল কী হয়েছিল তা বের করা। তো আমার বন্ধুরা আমাকে বললো হারুন তুমি একটা লিখে ফেলো। আমি বসে খুব যত্ন করে, তোমাকে যেমন বললাম, আগাগোড়া দুই দিনের ঘটনা লিখে ফেললাম। এটা আমরা জমা দিলাম যেখানে জমা দিতে বলা হয়েছিল। তারপরে তখন যে সংগ্রাম পরিষদ ছিল সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, বলা হলো যে এই এলিস এনকোয়ারি কমিশন দিয়ে কিছুই হবে না, আমরা কেউ তার সঙ্গে সহযোগিতা করবো না। তো ঐ কমিশনের ওখানেই সমাপ্তি। এই আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা- ২১শে ও ২২শে ফেব্র্রুয়ার।

 
trans
তথ্যসূত্র :

১। ব্যক্তিগত যোগাযোগ : অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ
২। Biographical Information of Bose Professor A.M. Harun ar Rashid, অপরেশ কুমার ব্যানার্জী, উপ পরিচালক, বাংলা একাডেমী
৩। From A Vision To A System, Editor: A. M. Hamende; The International Centre For Theoretical Physics, Trieste (1964-1994); A Tribute to Abdus Salam, Nobel Laureate, Founder, First Director and Honorary President of the ICTP, On the occasion of the Thirtieth Anniversary of the Centre; Page Number: 252- 261

বিশেষ কৃতজ্ঞতা :
অপরেশ কুমার ব্যানার্জী
উপ পরিচালক, বাংলা একাডেমী ধন্যবাদ :
এ. কে. এম. সাজেদুল ইসলাম
সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ (Centre of Excellence for Scientific Research), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক : মোঃ কুতুব উদ্দিন

Share on Facebook
Gunijan

Content on this site is licensed under Creative Commons Attribution-Noncommercial 3.0 Unported.
© 2014 All rights of Photographs, Audio & video clips and softwares on this site are reserved by
.