আবদুল মান্নান সৈয়দ আর নেই। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, কাব্যনাট্য,
প্রবন্ধ-গবেষণা, সমালোচনা—সব দিকে জীবনের অন্তিমপর্ব পর্যন্ত সমান সচল এই
লেখকের জীবনের অবসান হলো। গতকাল রোববার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
২৭ আগস্ট ঢাকার একটি টিভি চ্যানেলে কবি নজরুল বিষয়ে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে
মান্নান সৈয়দ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
পরদিন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাঁকে তাঁর গ্রিন রোডের বাসায় নিয়ে আসা
হয়। তাঁর ভাই সৈয়দ মাসুদ জানান, তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। গতকাল রোববার
সন্ধ্যায় আবার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাঁকে ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে
যাওয়া হয়। কিন্তু আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি স্ত্রী
সায়রা সৈয়দ, একমাত্র মেয়ে জিনান সৈয়দ, ভাই, বোন, বন্ধু, অসংখ্য পাঠক ও
গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্ম ৩ আগস্ট ১৯৪৩-এ, পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায়।
বাবা সৈয়দ এ এম বদরুদ্দোজা ও মা কাজী আনোয়ারা মজিদ। দাঙ্গা ও দেশভাগের
ডামাডোলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের এই বাংলায় আসা-যাওয়া শুরু হয়েছিল।
১৯৫০-এ তাঁদের পরিবার স্থায়ীভাবে পূর্ববাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশে চলে আসে।
মান্নান সৈয়দ পড়াশোনা করেছেন ঢাকায়। নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে
মাধ্যমিক (১৯৫৮), ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক (১৯৬০) এবং ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ (সম্মান) ও এমএ (১৯৬৪) করেন। দীর্ঘদিন
জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক
ছিলেন। পরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
গত শতকের ষাটের দশকে উন্মাতাল রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়নের মধ্যে
বাংলাদেশে প্রতিভাবান একদল লেখক-শিল্পীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। আবদুল মান্নান
সৈয়দ তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭)
পাঠকমহলে ও সমালোচকদের বিপুল প্রশংসা পায়। শুধু কবিতা নয়, পরবর্তীকালে
গল্প-উপন্যাসের জন্যও তিনি আলোচিত হন। অন্যদিকে প্রবন্ধ-গবেষণায়ও তিনি তাঁর
স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রাখেন। বিশেষ করে নিভৃতচারী কবি জীবনানন্দ দাশ
বিষয়ে তিনি বিরতিহীন লিখে গেছেন। জীবনানন্দ বিষয়ে তাঁর শুদ্ধতম কবি
(১৯৭০) বইটি উভয় বাংলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করে। তাঁর
গবেষণার আরেকটি বড় ক্ষেত্র কাজী নজরুল ইসলাম। ঈশ্বর গুপ্ত থেকে আবিদ
আজাদ—অসংখ্য কবি ও কথাশিল্পীকে নিয়ে তিনি লিখেছেন। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ,
মধুসূদন, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বিষয়ে তাঁর
বিশেষ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তিনি বেশ কিছু সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করেছেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দের গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—কবিতা: জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ,
জ্যোৎস্না রৌদ্রের চিকিৎসা, পার্ক স্ট্রীটে এক রাত্রি, কবিতা কোম্পানী
প্রাইভেট লিমিটেড, মাছ সিরিজ ইত্যাদি। গল্প: সত্যের মতো বদমাশ, চলো যাই
পরোক্ষে, উপন্যাস: পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী, কলকাতা, অ-তে অজগর। প্রবন্ধ:
শুদ্ধতম কবি, দশ দিগন্তের দ্রষ্টা, নজরুল ইসলাম: কালজ কালোত্তর, ছন্দ,
রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি। তিনি নাটক লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, সম্পাদনা করেছেন
পঞ্চাশের বেশি বই। সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বিভিন্ন সময়ে একুশে পদক, বাংলা
একাডেমী পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন।
প্রথম আলোতে আজ সোমবারও আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। ঈদ
উপলক্ষে প্রথম আলোর বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘ঈদ উপহার’-এ তিনি তাঁর একটি কবিতা
প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘যে-আমি কবিতা লিখি’। প্রথম আলোর নিয়মিত লেখক ছিলেন
তিনি। এ ছাড়া প্রথম আলোর বর্ষসেরা বইয়ের বিচারকমণ্ডলীর সদস্যও ছিলেন।
মান্নান সৈয়দের মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মুঠোফোনে। তাঁর গ্রিন রোডের
বাসায় ভিড় জমে পাঠক, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীদের। বাবার জন্য তাঁর মেয়ের
হাহাকারে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মান্নান সৈয়দের অগ্রজ বন্ধু ও বহুদিনের সঙ্গী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের
প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ গতকাল এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘আবদুল
মান্নান সৈয়দ একজন বহুমুখী প্রতিভান্বিত লেখক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস,
কাব্যনাট্য, প্রবন্ধ, সমালোচনা—সব দিকে তাঁর উজ্জ্বলতা অসামান্য। আমাদের
দেশে এই মানের মানুষ একে একে শূন্য হচ্ছে, যাঁদের কোনো বিকল্প পাচ্ছি না।
মান্নানের মৃতুতে বিশাল শূন্যতা হলো—এটা পূরণ হবার নয়।’
মান্নান সৈয়দের কবিবন্ধু সিকদার আমিনুল হক, যিনি মান্নান সৈয়দের আগেই চলে
গেছেন—একদা ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ’ শিরোনামে এক কবিতায় লিখেছিলেন,
‘র্যাঁবোকে দেখিনি। তবে মান্নান সৈয়দ একা একা/ হাঁটতেন অপরাহ্নে কিংবা
রাত্রিবেলা। সারাদিন/ পর চেনা গ্রিন রোড আর নেই।’ হ্যাঁ, গ্রিন রোডে
হাঁটতেন মান্নান সৈয়দ। আর হাঁটবেন না।
জানাজা: আজ সোমবার সকাল ১০টায় তাঁর মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বাংলা
একাডেমী প্রাঙ্গণে রাখা হবে। বাদ জোহর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ চত্বরে। তাঁকে দাফন করা হবে আজিমপুর
কবরস্থানে।
শোক: কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দের মৃত্যুতে বিএনপির
চেয়ারপারসন ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তথ্য
ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার
হোসেন, তথ্যসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁর
বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা
প্রকাশ করেছেন।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০