মাত্রই জন্মেছে শিশুটি। আধাসের বা এক পাউন্ড ওজন। লম্বায় পূর্ণ বয়স্ক মানুষের এক বিঘত অর্থাৎ প্রায় নয় ইঞ্চি। চোখ ফোটেনি এখনও। মাথার চারিদিকে সামান্য অস্থি। শক্ত হয়নি মাথার খুলি, তাই গোল মাথাটি সবসময় স্থিত থাকেনা গোল অবস্থায়। পরিবর্তীত হয় আকৃতিতে। মাতৃগর্ভে অবস্থানের সময়ও বেশি নয়। ৭ মাসের পরপরই পৃথিবীর আলো বাতাসে আসে। মাতৃগর্ভে পূর্ণাঙ্গ সময় অবস্থান না করা হেতু, পরিপূর্ণ বিকাশের অবকাশ হয়ে ওঠেনি। ইনকিউবেটর ছাড়া বাঁচানোর চিন্তা করা কষ্টসাধ্য। বাংলাদেশের এক অজপাড়া গাঁ, সময়টাও সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তাই সে সময় সেখানে ইনকিউবেটরের চিন্তা বাতুলতা বা অচিন্তনীয়। শিশুটির মায়ের বয়স মাত্র ১৫ কি ১৬। সবাই তাকে সান্ত্বনার বাক্য শোনায়। আত্মীয় পরিজন থেকে গ্রামের নাপিত সবার এক কথা এ শিশুকে আর বাঁচানো যাবে না। কিন্ত এহসান সাহেব এসব মাথায়ই ঢুকতে দিচ্ছেন না। সম্পর্কে শিশুটির ছোট নানা। পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছেন শিশুটির। পরিচ্ছন্ন সাদা নরম কাপড়ের টুকরো দুধে ভিজিয়ে ভিজিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছেন শিশুটিকে। বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। দিনের পর দিন এভাবেই খাওয়ানোর চেষ্টা ও পরিচর্যা। শেষ পর্যন্ত সবাইকে অবাক করে দিয়ে বেঁচে যায় শিশুটি। শুধু তাই নয়, ৯ মাস বয়সে হাঁটতে শুরু করে অন্য ১০ টি শিশুর মতোই। বাবা-মা, নানা-নানী, আত্মীয়- স্বজন, পাড়া- প্রতিবেশী-পরিজন আনন্দিত। যার আশা আঁতুড়ঘরে সবাই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল, সে বেড়ে উঠতে থাকে আত্মীয় পরিজন পরিবেষ্টিত এক আনন্দময় জগতে। এহসান সাহেবের হৃদয়ে পরিতৃপ্তির আনন্দ ছড়িয়ে দেয়, সুস্থ ভাবে বেড়ে উঠতে থাকা শিশুটি। পরিশ্রম সার্থক তাঁর। আনন্দে ভিজে ওঠে চোখ।
শিশুটির নাম রাখা হয় আবুল ফজল শাহাবুদ্দীন। ডাক নাম হুমায়ুন। যিনি পরবর্তীতে ফজল শাহাবুদ্দীন নামে বাংলা কবিতায় এবং সাংবাদিকতায় বিশিষ্ট আসন দখল করেন। সব্যসাচী লেখক আব্দুল মান্নান সৈয়দ যাঁকে বাংলাদেশের ‘প্রথম উজ্জ্বল আধুনিক কবি’ মনে করেছেন- তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কবিতা উপহার দেবার জন্য।
কাজী তামীজউদ্দিন আহমদ ও মোসাম্মৎ রহিমা খাতুনের প্রথম সন্তান ফজল। জন্মস্থান কুমিল্লার নবীনগর থানার শাহপুর গ্রামে। বাংলা বা ইংরেজী কোন জন্ম তারিখই সংরক্ষণ করেনি কেউ। ঢাকা বোর্ডের হাইস্কুল এক্সামিনেশনের সার্টিফিকেটে জন্ম তারিখ ০৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৬। সেই হিসেবে তাঁর আগমনের সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো পৃথিবী ওলট-পালটকারী ঘটনার সম- সাময়িক। জন্মের ৮ মাস পরই মায়ের সাথে বাবার কর্মস্থল ঢাকায় চলে আসা। শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের উন্মেষ ঢাকাতেই। আরও পরিপূর্ণ হয় পুরান ঢাকাতেই বললে। পরবর্তীতে নিজেকে ‘পুরান ঢাকার ফসল’ বলেছেন ফজল। আর তাই বোধ করি ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার নবীনগরে জন্ম হলেও পাসপোর্টে জন্মস্থান ‘ঢাকা’।
শৈশবের শুরুটা কাটে পুরান ঢাকার দক্ষিণ মৈশন্ডির লালমোহন শাহা স্ট্রীটের ১৫২ নম্বর বাড়িতে। প্রায় ধোলাই খালের পাড়েই বলা যায়। ৪ রুমের ১ তলা বাড়ি। ছোট উঠান। ভাড়া ৫ টাকা। ছোট ছোট মিষ্টি বরাইয়ের বিশাল একটি গাছ ছিল সে বাড়িতে। সে সময়ের ধোলাই খাল এখনকার মতো পানিশূন্য আর দূর্গন্ধময় ছিল না, বিপরীতে ছিল ছোট নদীর মতো। বাতাসের সাথে যেখানে পানিতে ছোট ছোট ঢেউ উঠতো। নৌকা বাইচও হতো। ঝাঁপ দিয়েছেন খালের উপর নারিন্দা পুল থেকে, সাঁতরেছেন সেই ঢেউ ওঠা টলমলে জলে! তাদের বাড়ির রান্নাঘর ছিল দক্ষিনে প্রসারিত এক গলির মুখোমুখি। তাঁর মা রান্না করতেন সেখানে। সেই গলি বেয়ে ধোলাই খালের গন্ধ বওয়া শীতল বাতাস আসতো রান্না ঘরের জানালায়। ফজল নিজেই বর্ণনা করেছেন চমৎকার। “রান্নাক্লান্ত আম্মা কখনও কখনও এসে দাঁড়াতেন, জানলার কাছে সম্ভাবতঃ সেই বাতাসের জন্য। বাতাসে আম্মার চুল উড়তো, চোখের মণি উজ্জলতর হতো। আম্মার সেই মুখ চোখ আর চুল এখনও আমার মনে আছে। মনে থাকবে যতদিন বেঁচে আছি।’’ [আমার কবিতা- ফজল শাহাবুদ্দীন]
এরপর চলে আসেন কমলাপুর। কায়েস্থপাড়ায়। কমলাপুর তখন গ্রাম। ৯ বিঘার উপর বিশাল টিনের বাড়ি, পুকুর, ফলের বাগান তাতে প্রচুর আমের গাছ। বর্ষাকালে নৌকায় চড়ে যেতে হতো। আমের সময়, মাচায় তুলে রাখা পাকা আম খেতে চলে আসতেন বাংলা সাহিত্যের স্বনামখ্যাত শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, আব্দুল গাফফার চৌধুরী। আরও পরে যৌবনে বন্ধুত্বের আর কবিত্বের সূত্রে যাদের সাথে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা। আমের রস আর কবিতার রসে মাখামাখি আড্ডা চলেছে সারাদিন, অনেকদিন। তবে সে আরও পরের কথা।
নারিন্দা এলাকায় সাহেবদের গোরস্থানের পাশের নির্জন প্রাইমারী স্কুল, কাজী আব্দুর রশিদ প্রাইমারী স্কুলে একাডেমিক লেখাপড়ার শুরু। এরপর ঢাকা কলিজিয়েট স্কুল এবং পরে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ। মাঝখানে পড়াশোনায় সাময়িক ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে খন্ডিত কলেজ জীবনে কিছু দিন পড়াশোনা পুরান ঢাকারই মদন মোহন বসাক রোডের সলিমুল্লাহ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও লক্ষ্মীবাজারের কায়দে আজম কলেজে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী কলেজ)। মেট্রিক পরীক্ষা দেন ১৯৫০ সালে ঢাকা কলিজিয়েট স্কুল থেকে। তাদের ৪ ভাই ৩ বোনের সবাই ছিলেন কলিজিয়েটের ছাত্র। স্কুলে পড়াশোনায় না হলেও খেলাধূলায় ছিলেন ভালো। খুব অল্প বয়সে ১৯৪৬ সালে, আসাম- বাংলা- উড়িষ্যা নিয়ে তৎকালীন ইস্টার্ন ইন্ডিয়া স্পোর্টস মিট এ অংশ নেবার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।
মেট্রিকের পর ঢাকা জগন্নাথ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট এ ভর্তি হন। ভাষার অধিকারের দাবিতে উত্তাল স্বদেশ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ফজল জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। ২১ শে ফেব্রুয়ারী মেডিকেল কলেজের সামনে গুলি বর্ষণের সময় উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন, ভাষা আন্দোলনের শহীদের স্মরণে তৈরি প্রথম শহীদ মিনার পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গুড়িয়ে দেবার সময়ও। ভাষা আন্দোলন তাঁর তারুণ্যকে নাড়াদেয় ভীষণ ভাবে। কলেজ জীবনের বন্ধু আনোয়ারুল করিমের সাথে ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্রকাশ করেন ফেব্রুয়ারী মাসেই। প্রথম শহীদ মিনারের ছবি দিয়ে করেন প্রচ্ছদ। তাতে তাঁর লেখা বিপ্লবী কবিতা ‘চিমনীর ধুয়া’ প্রকাশিত হয়। ঢাকা হাটখোলার ইম্পেরিয়াল প্রেসে ছাপা হয় পুস্তিকাটি। প্রকাশনার সাথে সাথে পাকিস্তান সরকার বাজেয়াপ্ত করে সেটি।
ভাষা আন্দোলনের পরপরই ফজলের লেখাপড়া সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। বায়ান্ন সালের অস্থিরতায় ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়া হয় না। পারিবারিক অবস্থাও খুব সচ্ছল নয় তখন। ৫৩ সালের শেষে ঢাকার নবাবদের ‘নওয়াব এস্টেট’ অফিসে স্বল্প বেতনে চাকুরী নেন। মাইনে মাসে ৬২ টাকা। এক বন্ধু যোগাড় করে দেন চাকুরীটি। কয়েকমাস কাজও করেন। এরপর সে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ঢাকা নওয়াবপুর পোষ্ট অফিসের কাউন্টার ক্লার্কের চাকুরীতে যোগ দেন। প্রায় ৪/৫ বছর সেখানেই ছিলেন। এসময় পড়াশোনাটা আবার শুরু করেন। রাতে ক্লাস করতে থাকেন পুরান ঢাকার মদন মোহন বসাক রোডের সলিমুল্লাহ মুসলিম কলেজে। ২ বছর পর সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৬০ সালে ঢাকার কায়দে আজম কলেজে ভর্তি হয়ে বি.এ পরীক্ষা দেন। এ সময় তিনি নানা রকম পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু নবাব এস্টেট বা পোষ্ট অফিসের কাউন্টার টেবিল অথবা অন্য কোথাও যা কিছু ঘটুক না কেন কবিতা লেখা চলেছে আর চলেছে আড্ডা। সদরঘাট পোষ্ট অফিস পেরিয়ে একটু সামনেই বিউটি বোর্ডিং। ওখানে আড্ডা জমতো। জমাতেন বাংলা সাহিত্যের প্রধান পুরুষেরা- ফজল শাহাবুদ্দীন, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, ওমর আলী আরোও অনেকে। যৌবনে, আড্ডায়, গল্পে, কবিতায়, বন্ধুত্বে এভাবেই একসাথে পথ চলেছেন তাঁরা। এগিয়েছে বাংলা সাহিত্য।
ফজল শাহাবুদ্দীনের বাবা কাজী তামীজ উদ্দিন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন শাস্ত্রে অনার্স। ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার স্কুল থেকে সেসময় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় তিনি ছিলেন প্রথম ২০ জনের মাঝে। বাংলা, আসাম ও উড়িষ্যার বিশাল এলাকা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিলো। তাঁর সাহিত্যপ্রীতিও ছিল প্রবল। শনিবারের চিঠি, বসুমতি, ভারতবর্ষ, প্রবাসী, সওগাত, মোহাম্মাদী ইত্যাদি পত্রিকা রাখতেন। ছিল ফরাসি আর সংস্কৃত সাহিত্য সম্পর্কিত বই। বাবার তুলনায় ফজলের প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল অনুজ্জ্বল। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় ফজলের ওপর প্রভাব ফেলতে না পারলেও তাঁর সাহিত্যপ্রীতি প্রভাব ফেলেছিল ফজলের উপর। বই ও পত্রিকার সমৃদ্ধ সংগ্রহ ফজলের সাহিত্য প্রেমকে প্ররোচিত করতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছিল।
কলেজে পড়ার সময় অর্থাৎ ১৯৫২ সাল থেকেই শুরু কবিতা চর্চা। প্রথম কবিতা ‘সন্ধ্যা’, ছাপা হয় মাসিক ‘মাহে নও’ এবং কবি তালিম হোসেন সম্পাদিত দৈনিক মিল্লাতে। “পূর্ব বাংলার নিসর্গ এবং আমাদের কবি মানুষের উৎস”- প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় দৈনিক আজাদের সাহিত্য সাময়িকীতে। যার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবীব। ফজলের বয়স তখন ১৭। এরপর শুধু কবিতায় অবগাহন। কিন্তু ২২/২৩ বছর বয়সে তিনি ‘অরণ্য রাত্রী’ নামে একটি ছোট উপন্যাস লেখেন। লেখার ৩/৪ বছর পর তা প্রকাশিত হয় মুস্তফা মেহমুদ সম্পাদিত ‘মৃদঙ্গ’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায়। প্রকাশের সাথে সাথে গ্রেফতার হন লেখক, সম্পাদকসহ প্রকাশক ম্যানেজিং এডিটর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং মুদ্রাকর খন্দকার মোশতাক আহমদ। তখন ১৯৬১ সাল আইয়ুব খানের মার্শাল ‘ল’ সারাদেশে। পরে শামসুর রাহমানের জামিনে সূত্রাপুর থানা থেকে ছাড়া পান। ‘অরণ্য রাত্রী’ এসময় কাইয়ুম চৌধুরী অংকিত প্রচ্ছদ নিয়ে বই আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল। গ্রেফতার মামলায় ফজল ভয় পেয়ে যান এবং লেখা, প্রচ্ছদ, ব্লক প্যাকেট বন্দি করে মতিয়া চৌধুরীর কাছে গচ্ছিত রাখেন। সেগুলোর খোঁজ আর করেন নি কেউই। এসময় তাঁকে অনেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন যে, সাহিত্য রচনার জন্যে গ্রেফতার হওয়ার মাঝে কোন অমর্যাদা নেই।
১৯৫৬ সালের দিকে কিছুদিন দৈনিক মিল্লাতের নিউজ ডেস্কে কাজ করেন। ১৯৬২ সালের শুরুতে ঢাকার পাকিস্তান অবজারভার, বর্তমানে বাংলাদেশ অবজারভার গ্রুপে চাকুরী নেন। এরপর সাপ্তাহিক পূর্বদেশ এবং পরে সাপ্তাহিক চিত্রালীতে কাজ করেন। ৬৪’ সালের অক্টোবরে যোগ দেন সে সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৈনিক পাকিস্তান, স্বাধীনতার পর যা দৈনিক বাংলা নামে প্রকাশ হতে থাকে। এখানে কাজ করেন ৭৫ পর্যন্ত। দৈনিক বাংলায় থাকার সময়ই তিনি সাপ্তাহিক বিচিত্রার পরিকল্পনা করেন এবং প্রধানত তাঁর প্রচেষ্টাতেই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৮ সালে ফজল শাহাবুদ্দীনের হাত ধরে বিচিত্রার যাত্রা শুরু হয় মাসিক পত্রিকা হিসেবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের পর তা সাপ্তাহিক হয়। দুটো পত্রিকারই সম্পাদক তিনি। মূলত ফজল শাহাবুদ্দীনের হাত ধরেই এদেশের সাপ্তাহিক, মাসিকসহ সাময়িকী পত্রিকার অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা। প্রকাশনা জগতের নতুন দিকের ঐতিহাসিক সূত্রপাত। ৬৯ সালে লেখিকা লায়লা সামাদের সাথে প্রকাশ করেন ‘পাক্ষিক চিত্রিতা’। ছিলেন উপদেষ্টা সম্পাদক। স্বাধীনতার পর সম্পাদনা করেন ‘বিনোদন’। বাংলাদেশের মাটিতে সফল সৃষ্টি ‘বিনোদন’ দেখে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন-‘বাংলা ভাষায় এতো সুন্দর পত্রিকাতো আগে দেখিনি’। তখন ভারতবর্ষে আনন্দবাজার গ্রুপে কোন সাময়িকী প্রকাশ হয় নি।
পরবর্তীতে প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন মাসিক নান্দনিক। ১৯৯১ সালে মাত্র ১ বছর আয়ুষ্কালেরএ পত্রিকা পাঠক মহলে আলোড়ন তৈরি করেছিল। নতুন স্টাইলে পত্রিকা বাঁধায়, কভারে লেমিনেশন এর মাধ্যমে নান্দনিক করে তোলা,বাংলাদেশে এ পত্রিকার হাতেই হয়েছে। সাংবাদিক মহলে এ পত্রিকায় কাজ করার একটা ক্রেজ তৈরি হয়েছিল। পাক্ষিক চিত্রিতা, মাসিক বিনোদন, নান্দনিক, দৈনিক পাকিস্তান এবং দৈনিক বাংলায় ছায়ামঞ্চ ফিচার পাতার সম্পাদক ছিলেন ফজল। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন- ‘তিনি বিনোদন সাংবাদিকতায় কখনও গ্রাম্যতা, স্থূলতা ও শস্তা বিষয়কে প্রাধান্য দেন নি। তাঁর প্রত্যেকটি বিনোদন পত্রিকা ছিল আধুনিক ও আভিজাত্য। আমার ধারনা, পাক্ষিক চিত্রিতা এদেশের বিনোদন পত্রিকায় শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দাবি করতে পারে’।
বাংলা ১৩৬২ সালের বৈশাখ মাসে, ১৯৫৬ ইং সালে শামসুর রাহমানে সাথে যৌথ সম্পাদনায় কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদে বের করেন ‘কবিকন্ঠ’। অনুপ্রেরণায় বুদ্ধদের বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা। পত্রিকা প্রকাশের খরচ যোগাড়ে ফজল মায়ের দেওয়া আংটি বেচে দেন। কলকাতার জীবিত কোন কবির লেখা না নেওয়ার নীতি নির্ধারিত হওয়ায় পরলোকগত জীবনান্দদাশের দুটি অপ্রকাশিত কবিতা ‘তোমাদের যেখানে সাধ চলে যাও’ এবং ‘বাংলার মুখ আমি’ ছাপা হয়েছিল কবিকন্ঠে। কবিকন্ঠকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এদেশের একটি বৃহত্তম কবিতা আন্দোলন। যার পুরোধা তিনি। এছাড়া ১৯৮০ সাল থেকে কবিকন্ঠকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় বসন্তকালীন কবিতা উৎসব।
শুধু সাংবাদিক আর কবিই নয়। ফজল শাহাবুদ্দীন ছিলেন কবিতার এক্টিভিস্ট। তিনি ১৯৮৭ এবং ১৯৮৯ সালে এশীয় কবিতা উৎসবের প্রধান কর্ণধার ছিলেন। কবিতা কেন্দ্রের আয়োজনে এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এশীয় কবিতা উৎসবে অংশ নেন- বৃটিশ রাজকবি টেড হিউস, তুরষ্কের ইলহান বার্গ, জাপানের কাজুকো শিরাইশি, ভারতের সচ্চিদানন্দ বাৎসায়ন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, পাকিস্তানের আহমদ ফারাজ, মালয়েশিয়ার জেহাদি আবাদি, ইরানের তাহের সফর জাদেহ প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে কিছু দিন থাকেন। এরপর নরসিংদী হয়ে নবীনগরের শাহপুর পৌঁছে, সেখানে কিছুদিন বাস করেন। রাতে কখনও বাসায় থাকতে পারেন নি। একেক দিন থাকতে হতো একেক জায়গায়। ঢাকায় অবস্থানকালীন যেন মৃত্যুর তাড়া খেয়ে বিভিন্ন সময় অবস্থান পরিবর্তন করে করে, পদেপদে মৃত্যুকে এড়িয়ে, লুকিয়ে জীবন ধারণ। চিন্তায় স্বদেশ। ঢাকায় রুদ্ধশ্বাস জীবন, গ্রামে দখলদার বাহিনীর নৃশংসতা এবং বর্বরতা। দেখেছেন নদীতে ভাসছে লাশ, চোখ হাত পা বাঁধা অসহায় মানুষের দল, যেন অসহায় বাংলার প্রতিচ্ছবি। ‘আততায়ী সূর্যাস্ত’-তে এ সময়ের অসম্ভব সব অনুভব গ্রন্থিত হয়েছে।
“বাংলাদেশ আগুন লাগা শহর আর লক্ষ গ্রাম
বাংলাদেশ দুর্গময় ক্রুদ্ধ এক ভিয়েতনাম”।
[বাংলাদেশ একাত্তরে]
মুক্তিযুদ্ধের আগে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে লোকমুখে ফিরেছে। ২৫ মার্চের আগেই দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নতুন ভিয়েতনাম’ কবিতায় লেখেন-
“রাইফেল আর বেয়নেট নিয়ে কারা
মত্ত শিকারে নেমেছে বাংলাদেশে
. . . . . . . . . . . . . . . . . . .
রাইফেল ধারী বেয়নেট ধারী শোন
তোমাকে চিনেছি তুমি খুনি পুরাতন
আমার মায়ের কন্ঠে চালাতে ছুরি
তুমি এসেছিলে সেই কবে ফাল্গুনে”
মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ফেরারী আসামীর ভয় বুকে নিয়ে ফজলকেও লাখ বাঙ্গালীর মতো অবরুদ্ধ দেশে বাস করতে হয়েছে। ‘কোথায় পারিনি যেতে’ প্রতি ছত্রে যেন বন্দি স্বদেশ ও স্বদেশবাসীর উচ্ছ্বসিত কাতর ধ্বনি জমাট বাঁধা।
‘কোথাও পারিনি যেতে কোনদিন যাবো না কোথাও।
ধর্ষিতা মায়ের রক্তে ভেজা মাটি
তাকে ফেলে যাবো না কোথাও
… … . . . . . .
রক্তাপ্লুত বিবেকের মতো জি সি দেব
তাকে ফেলে যাবো না কোথাও’।
[বইঃ আততায়ী সূর্যান্ত। কবিতাঃ কোথাও পারিনি যেতে ]
পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শেষে ফজল হারুণ ইন্টারপ্রাইজের ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। ৬২/১ পুরানা পল্টন, হারুণ ইন্টারপ্রাইজের অফিস দোতলায়। চেয়ারম্যান- বন্ধু হারুণ রশিদ। মূলত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস হলেও এই রুমটি ছিল কবি সাহিত্যিকদের আড্ডা আর মিলনস্থল। এই রুমে বাংলা সাহিত্যের রথী মহারথী থেকে তরুণতম কবি সাহিত্যিকরাও আসতেন। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শহীদ কাদরী, মনিরুজ্জামান, শিকদার আমিনুল হক প্রমুখ। এছাড়াও চায়ের আড্ডায় মেতেছেন জার্মান কবি নোবেল বিজয়ী গুন্টার গ্রাস, তুরষ্কের ইলহার্ন বার্ক, ইরানের তাহের সফরজাদে, জাপানের কাজুকো শিরাইশি এবং এশীয়ার আরও বিখ্যাত সব কবিরা। এই রুম সম্পর্কে পারভেজ আনোয়ার যথার্থই লিখেছেন-‘……., আধুনিক বাংলা কাব্যের ইতিহাসে এরকম ব্যক্তিগত একটি রুম আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
পাকিস্তান চলচ্চিত্র সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ফজল, চলচ্চিত্র সমালোচনাও করেছেন এ দেশের চলচ্চিত্রের বিকাশের প্রারম্ভে। চলচ্চিত্রের জন্য লিখেছেন গান। তার লেখা দুটি বিখ্যাত গান
‘চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা,
ভালবাস যদি কাছে এসো না’
এবং
‘আমি যে আঁধারের বন্দিনী,
আমাকে আলোতে ডেকে নাও’।
সূর্যকন্যা চলচ্চিত্রে পরিচালক বন্ধু আলমগীর কবিরের জন্য লেখা হয় গান দুটি। কন্ঠ দিয়েছিলেন সন্ধ্যা ও শ্যামল মুখোপাধ্যায়।
১৯৭২ সালে ফজল যখন সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স পড়ুয়া আজমেরী ওয়ারেসের সাথে পরিচিত হন। বিশিষ্ট স্থপতি সামসুর ওয়ারেসের বোন আজমেরী লেখালেখি করতেন, সেই সূত্রেই পরিচয়। তারপর একসময় হৃদয়ের কাছের মানুষ হয়ে ওঠা। বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। বন্ধু হারুণ প্রস্তাব নিয়ে যান আজমেরীর বাসায়। ১৯৭৩ এর ১৫ই এপ্রিল, পারিবারিকভাবে বিয়ে। ৩ সন্তান দিনা, শমিত এবং অমিত। দিনা সাহাবুদ্দিন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার USAID এ কর্মরত, শমিত অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এবং অমিত BBA করেছেন দেশে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স, এম.এ ও এম.এড (শিক্ষা) আজমেরী বর্তমানে BIT ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
১৭ বছর বয়সে ১ম কবিতা লিখলেও প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ তারও ১২ বছর পর ২৯ বছর বয়সে ১৯৬৫ সালে ‘তৃষ্ণার অগ্নিতে একা’। প্রকাশক মওলা ব্রাদার্স । এরপর একে একে বেরিয়েছে ২৭ টি বই। তাঁর অন্যান্য বইগুলো হলো- অকাঙ্ক্ষিত অসুন্দর; আততায়ী সূর্যাস্ত ; অন্তরীক্ষে অরণ্য ; সান্নিধ্যের আর্তনাদ; আলোহীন অন্ধকারহীন; সনেটগুচ্ছ; অবনিশ্বর দরোজায়; আমার নির্বাচিত কবিতা; হেনীল সমুদ্র হে বৃক্ষ সবুজ; লংফেলোর নির্বাচিত কবিতা; দিকচিহ্নহীন; ছিন্নভিন্ন কয়েকজন; জখন জখম নাগমা; Selected Poems; Solitude; Towards the Earth; বাতাসের কাছে; ছায়া ক্রমাগত; নিসর্গের সংলাপ; পৃথিবী আমার পৃথিবী; ক্রন্দনধ্বনি; ক্রমাগত হাহাকার প্রভৃতি। শেষ বই ‘একাকী একজন কবি’ । পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৩) এবং ২১ শে পদক (১৯৮৮)। বাংলাদেশের বসন্তকালীন কবিতা উৎসবের প্রবর্তক, এশীয় কবিতা উৎসবের প্রধান সমন্বয়কারী ফজল ছিলেন উদারমনা।
১১/১ নং মধ্যবাসাবোর পৈত্রিক ভিটাতেই ‘নিভৃতি’ নামে একটি ৫ তলা বাড়ি করেন । জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই বাড়িতেই নিভৃতে বসবাস করেছেন ফজল শাহাবুদ্দীন- ‘একজন কবি একাকি’-র কবি। ২০১৩ সালের শেষে ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মাঝে চলে আসে ৭৮ তম জন্মদিন। কবি একবার উচ্চারণ করেছিলেন-
“আজ আমার ত্রিশ লক্ষ তম জন্মদিন।
আমি আজ ও বেঁচে আছি
এবং বেঁচে থাকব চিরকাল”
এর ৫ দিন পরই ২০১৪ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারী সকাল ১১ টায় তিনি পৃথিবী পরিভ্রমণের ইতি টানেন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে ফজল তেহেরান গিয়েছিলেন ‘শাহানামা’ কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের ১০০০ বছর পূর্তি উৎসবে যোগ দিতে। কবির জীবন ক্ষণস্থায়ী কিন্তু কবিতার জীবন অবিনশ্বর। ক্রমাগত অসীমের দিকে ধাবমান। শাহানামা তার প্রমাণ। ফজল চলে গেছেন তাঁর কবিতা আছে। রয়েছে পৃথিবীতে মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্কেররেশ। তাঁর কবিতায় কি দার্শনিক উচ্চারণ-
“ম’রে গেলে কি মানুষের বয়স বাড়ে?
যীশু খ্রিস্টের বয়স কি এখন
১৯৮১ বছর?
ক্লিওপেট্রার বয়স এখন কত?
বুদ্ধের বয়স কি প্রতিদিন বেড়েই চলেছে?”।
জীবনান্দ দাশ তাঁর নিজের সময়েই মূল্যায়িত হননি। আর ফজল শাহাবুদ্দীন? পারভেজ আনোয়ার লিখেছেন- ‘ফজল শাহাবুদ্দীন এখনও অনাবিষ্কৃত’। কিন্তু কি তাই? যার উচ্চারণ দৃঢ়। স্পস্ট। যার বক্তব্য ভাবায়, কিন্তু ধাঁধায় ফেলে না। তিনি কি করে অনাবিষ্কৃত থাকেন। যিনি নিজেই দৃঢ় উচ্চারণের ঘোষণা করেন-
‘আমি ফজল শাহাবুদ্দীন,
জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের অন্য নাম
কবি এবং তারুণ্যে লেলিহান’।
তথ্য সূত্রঃ
সাক্ষাৎকারঃ আজমেরী শাহাবুদ্দীন [কবির স্ত্রী] ০৮.১২.১৬, সাক্ষাৎকারঃ হারুন রশীদ [কবির বন্ধু] ০১.০২.১৭, সাক্ষাৎকারঃ জনাব জাহাঙ্গীর [কবির ভাই]০৮.১২.১৬
১. ‘একজন কবি একাকি’, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, প্রথম সংস্করণঃ অক্টোবর ২০১৩, প্রকাশক ও মুদ্রণঃ নূরুল আকতার, হেল্পলাইন রিসোর্সেস এর পক্ষে, ৪৬/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা – ১০০০
২. ‘কবিকন্ঠ’, বিশেষ সংখ্যা, সপ্তম বসন্তকালীন কবিতা উৎসব ১৯৯৮, ৬২, পুরানা পল্টন তিনতলা ঢাকা ১০০০ বাংলাদেশ
৩. ‘কবিকন্ঠ’, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন স্মারক গ্রন্থ, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী ২০১৫, সম্পাদক: আমিনুর রহমান, প্রকাশক: কবিকন্ঠঃ ইউ টি সি ভবন, ৯ম তলা, ৮ পান্থপথ,
ঢাকা -১২১৫
৪.আমার কবিতা, ফজল শাহাবুদ্দীন, প্রকাশকঃ দীনা শাহাবুদ্দীন, কবিকন্ঠ প্রকাশনীর পক্ষে, কবিকন্ঠ প্রকাশনী, ৬২, পুরানা পল্টন তিনতলা ঢাকা ১০০০ বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২০০১/ অগ্রাহায়ণ ১৪০৮
লেখক: রাজিত আলম পুলক