তারুণ্যের গান, সৃষ্টির উন্মাদনা ও বিদ্রোহের অগ্নি জেলে সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন সোমেন চন্দ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সোমেন চন্দ সম্পর্কে লিখেছিলেন, “নিজস্ব একটি জীবনদর্শন না থাকলে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। সোমেন চন্দ ছিল কমিউনিস্ট। সাহিত্যিক হিসেবেও তার রচনায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে কমিউনিজমের জয়ধ্বনি”।
সোমেন চন্দ অন্যায়, অত্যাচার, অসঙ্গতি ও অসহায়ত্বের কাছে কখনো মাথা নত করেননি। সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ছিলেন আপোষহীন। রাজপথে শোষিত মানুষের অধিকার আদায় ও শ্রেণী বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সংগ্রাম আর লেখালেখির মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতি তুলে আনার অবিচল প্রত্যয়ে তিনি ছিলেন ইস্পাতদৃঢ়। সোমেন চন্দের সাহিত্য ছিল কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষকে ঘিরে। শোষণ-বৈষম্য থেকে মানুষকে মুক্ত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন। এস্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে নিয়েজিত করেন সেই শৈশব থেকে। ইস্পাতদৃঢ় সংকল্প নিয়ে শোষণমুক্তির লড়াই-সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন। সোমেন চন্দ এমন একটি মানুষ, যার সৃষ্টি হতাশাগ্রস্ত প্রতিটি মানুষকে জাগ্রত করে নতুন উদ্যমে পথ চলতে সহয়তা করে।
কমিউনিজম ছিল তাঁর প্রেরণা। কমিউনিজমের দর্শনের আলোয় চেতনাকে তিনি প্রতিনিয়ত শান দিতেন। কমিউনিজমই ছিল তাঁর মূল জীবনদর্শন। কলম ছিল তাঁর সংগ্রামের পাথেয়। আর খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ ছিল তাঁর বেঁচে থাকার প্রেরণা ও সৃষ্টির মোলিক কাঁচামাল। খাঁটি কমিউনিস্ট বলতে যা বুঝায়, সোমেন চন্দ ছিলেন তাই।
সোমেন চন্দ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ২৪ মে, মাতুলালয়ে। ঢাকার নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গার পশ্চিম পাড়ে শুভাড্ডা ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামে। তবে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত সোমেন চন্দ (জীবনী গ্রন্থমালা) বইয়ে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন, ‘সোমেন চন্দের জন্ম কেরানীগঞ্জ থানার অধীনস্থ পারজুয়া এলাকায় অবস্থিত ধিতপুর গ্রামে’। তাঁর বাবার নাম নরেন্দ্রকুমার চন্দ। আর মায়ের নাম হিরণবালা। সোমেন চন্দের পিতামহের নাম রামকুমার। নরেন্দ্রকুমার চন্দের আদিনিবাস ছিল ঢাকার নরসিংদি জেলার বালিয়া গ্রামে।
নরেন্দ্রকুমার চন্দ ঢাকার মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল ও হাসপাতালের স্টোরস বিভাগে চাকুরি করতেন। মা হিরণবালা। তিনি ছিলেন কেরানীগঞ্জের মেয়ে। মাত্র ৪ বছর বয়সে সোমেন চন্দ তাঁর মাকে হারান। হিরণবালার মৃত্যুর পর নরেন্দ্রকুমার সোমেন চন্দকে লালন-পালনের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তিন মাইল পশ্চিমে ‘ধউর’ গ্রামের ডা. শরৎচন্দ্র বসুর কন্যা সরযূদেবীকে বিয়ে করেন। সোমেন চন্দ সৎ মা সরযূদেবীকে মা বলে জানতেন। আর সরযূদেবীও সোমেন চন্দকে নিজের সন্তানের মতো আদর-স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে বড় করেছেন। বাবার চাকুরির কারণে ঢাকায় তিনি বেড়ে উঠেছেন। এখানেই তাঁর শৈশব-কৈশোর ও মানস চেতনা গড়ে উঠে। সোমেন চন্দ শহরের বাইরে অর্থাৎ গ্রামে একনাগাড়ে কখনো বসবাস করেননি। তবে মাঝে মাঝে তিনি মামা বাড়ি ‘ধউর’ গ্রামে বেড়াতে যেতেন। তাঁর শৈশব- কৈশোরের বেশকিছু সময় কাটে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারে।
সোমেন চন্দের পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। বিশেষ করে বাবার কাছে। তারপর অশ্বিনী কুমার দত্তের কাছে পড়াশুনা করেন। প্রাথমিক পড়াশুনা শেষে ১৯৩০ সালে তাঁকে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করে দেয়া হয় পুরান ঢাকার পোগোজ হাই স্কুলে। এই স্কুল থেকে ১৯৩৬ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ডাক্তারী পড়ার জন্য ভর্তি হন ঢাকা মিডফোর্ড মেডিকেল স্কুলে। কিন্তু অসুস্থতার কারণে পড়াশুনা আর চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি।
১৯৩৫ সালের নভেম্বরে লন্ডনে ভারতীয় ও বৃটিশ লেখকদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ই এম ফরস্টার, হ্যারল্ড লাস্কি, হার্বাট রিড, রজনী পাম দত্ত, সাজ্জাদ জহির, মূলক রাজ আনন্দ, ভবানী ভট্টাচার্য প্রমুখ। নানা আলোচনার পর তাঁরা একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন ডিসেম্বরে। এরই সূত্র ধরে ভারতে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ গঠিত হয়। চার বছর পর ঢাকায় স্থাপিত হয় এর শাখা। লন্ডন বৈঠকে সাহিত্যিকরা এ সংগঠনের নাম ‘প্রগতি সাহিত্য সংঘ’ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যখন ইশতেহার প্রকাশিত হয় তখন প্রস্তাবিত নাম রাখা হয় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিলের এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিখ্যাত হিন্দি লেখক মুন্সী প্রেমচান্দ। সভায় সংগঠনের নামকরণ করা হয় ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’। এর সভাপতি নির্বাচিত হন প্রেমচান্দ, সম্পাদক সাজ্জাদ জহির।
১৯৩৭ সালে সোমেন চন্দ প্রত্যক্ষভাবে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩৮ সালে তিনি কম্যুনিস্ট পাঠচক্রের সম্মুখ প্রতিষ্ঠান প্রগতি পাঠাগারের পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন তিনি ও তাঁর পরিবার শহরের দক্ষিণ মৈশন্ডিতে থাকতেন। এসময় তিনি বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশীর মতো আজীবন বিপ্লবী শিক্ষকের রাজনীতি ও দর্শনের পাঠ নেন। রনেশ দাশ গুপ্তের সান্নিধ্যে থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, ম্যাক্সিম গোর্কী, মোপাঁসা, রঁলা, বারবুস, জিদ, মারলো, কডওয়েল রালফ ফক্সসহ আরো অনেকের লেখা বই পড়েন। তিনি রালফ্ ফক্স নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, সেটি নিম্নে উল্লেখ করা হল।
রালফ্ ফক্সের নাম শুনেছো?
শুনেছো কডওয়েল আর কনফোর্ডের নাম?
ফ্রেদরিকো গার্সিয়া লোরকার কথা জান?
এই বীর শহিদেরা স্পেনকে রাঙিয়ে দিল,
সবুজ জলপাই বন হলো লাল,
মার – বুক হল খালি –
তবু বলি, সামনে আসছে শুভদিন।
চলো, আমরাও যাই ওদের রক্তের পরশ নিতে,
ওই রক্ত দিয়ে লিখে যাই
শুভদিনের সংগীত।
১৯৪১ সালের ২২ জুন। হিটলার সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে। বিশ্বযুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নেয়। এ সময় ভারত উপমহাদেশের প্রগতিবাদী জনতা ফ্যাসিস্ট হিটলারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং স্তালিনের নেতৃত্বে সংগ্রামরত দেশপ্রেমিক সোভিয়েত যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জনযুদ্ধ ঘোষণা করে। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শান্তির লক্ষ্যে হীরেন মুখোপাধ্যায় ও স্নেহাংশু আচার্যকে আহ্বায়ক করে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে বঙ্গদেশে গড়ে উঠে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় প্রগতি লেখক সঙ্ঘের উদ্যগে গড়ে উঠে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এর যুগ্মসম্পাদক ছিলেন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। একপর্যায়ে সোমেন চন্দ এ সমিতির অন্যতম সক্রিয় সংগঠক হয়ে উঠেন। এই সমিতির প্রধান প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটা অন্যতম কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার অগ্রগতি প্রসঙ্গে চিত্র প্রদর্শনী করা। এই প্রদর্শনীতে ‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘে’র সোমেন চন্দের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাঁর অবিরত শ্রমের কারণে ঢাকায় অল্পদিনের মধ্যে ‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘ’ ও ‘সোভিয়েত সুহ্রদ সমিতি’ ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকায় এক সর্বভারতীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন আহ্বান করা হয়। তথাকথিত জাতীয়তাবাদী কিছু দল এ সম্মেলন বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। রেল শ্রমিকদের সাধারণ সম্পাদক সোমেন চন্দ রেল শ্রমিকদের মিছিল নিয়ে যখন সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তখন ঢাকার সুত্রাপুরে সেবাশ্রম ও লক্ষ্মীবাজারের হৃষিকেশ দাস লেনের কাছে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টির গুণ্ডারা তাঁর উপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন: “সোমেন হত্যার ব্যাপারটি, বিশেষ করে তখনকার পটভূমিতে এবং প্রেক্ষিতে এই হত্যাকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবাহী। সোমেন ছিলেন সে সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি, আর প্রগতি লেখক সঙ্ঘের অনেকখানি”। ১৯৪২ সালে সোমেন চন্দের মৃত্যুর পর কলকাতায় অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে প্রগতি ‘লেখক সঙ্ঘ’-র নামকরণ হয় ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’। ১৯৪৫ সালে কলকাতায় আবার এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’।
সোমেন চন্দের মৃত্যু সম্বন্ধে সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিচারণ: “ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন বাংলার সব জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে ঢাকা শহর ছিলো অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবি ও লেখকরা শহরে এক ফ্যাসিবাদ বিরোধী সম্মেলন আহবান করেন। স্থানীয় জেলা পার্টির অনুরোধে কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি ও জ্যোতি বসু সেখানে বক্তা হিসেবে উপস্থিত হন। সম্মেলন উপলক্ষ্যে শহরে খুবই উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক মহল প্রায় তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম যারা সম্মেলনের পক্ষে, দ্বিতীয় যারা সরাসরি বিপক্ষে, তৃতীয় যারা মোটামোটিভাবে তুষ্ণীভাব অবলম্বন করে নিরপেক্ষতার আবরণ নিয়েছিলেন। শেষোক্তদের মধ্যে প্রধানত কংগ্রেস মতবাদের অনুসারীরা ও দ্বিতীয় দলে ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী, বিশেষত শ্রীসংঘ ও বিভির লোকেরা। যাই হোক, সম্মেলনের দিন সকালে উদ্যোক্তাদের অন্যতম তরুণ সাহিত্যিক সোমেন চন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হন। তিনিই বাংলার ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের পরও যথারীতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং আমাদের প্রতি আরও লোক আকৃষ্ট হয়”।
সোমেন চন্দ প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রগতি লেখক সংঘের প্রধান সংগঠকও ছিলেন তিনি। সংঘের সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক বৈঠকগুলোতে নিয়মিত লেখা উপস্থাপনের তাগিদ থেকেই তাঁর সাহিত্যচর্চা বিস্তারলাভ করে। ১৯৪০ সালের শেষের দিকে কম্যুনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী হিসেবে ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলনের কাজ শুরু করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়া। ১৯৪১ সালে মাত্র বিশ বছর বয়সে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়।
১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময় গেন্ডারিয়া হাইস্কুল মাঠে সম্মেলনের মাধ্যমে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের উদ্বোধন করা হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কাজী আবদুল ওদুদ। রণেশ দাশগুপ্ত ও সোমেন চন্দ সংগঠনের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ বছর ছিল সোমেন চন্দের লেখক জীবনের পরিধি। তাঁর রচনার মধ্যে ছিল-২৬টি গল্প, একটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস, তিনটি কবিতা, দুটি একাঙ্কিকা ও আটটি চিঠি। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকায় ছড়িয়ে আছে তাঁর আরও কিছু রচনা। কিন্তু পত্রিকাগুলো দুষ্প্রাপ্য। ফলে এসব রচনা আজও উদ্ধার করা যায়নি। ২৬ টি গল্পের রচনাকাল, বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গির বিচারে গল্পগুলোকে দুটি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। ১ম পর্ব ১৯৩৭-৩৯ এবং ২য় পর্ব ১৯৩৯- ৪২ সাল পর্যন্ত। ১ম পর্বের গল্পগুলোর মধ্য বিভুতিভূষণের কিছুটা প্রভাব দেখা যায়। আর ২য় পর্বে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া সোমেন চন্দ পরিবর্তনে বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন বিপ্লবে। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ হিসেবেই রাজনীতি চলে আসে তাঁর লেখায়। নিত্যদিনের ঘরকন্নার মধ্য দিয়ে তিনি অবলীলায় দেখিয়ে দেন শাসনযন্ত্রের কুটিল চালপ্রয়োগ, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা ক্ষমতার সুক্ষ্ম জাল। তিনি লিখেছেন মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা ।
তাঁর রচিত ইঁদুর গল্পের ইঁদুরগুলো যেন দারিদ্রেরই কিলবিলে রূপ যা এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেয়না। ক্রমাগত শ্রেণীস্বাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রত নিম্ন মধ্যবিত্তরা। নিরেট প্রেমের গল্প ‘রাত্রিশেষ’-এও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে শ্রেণীসংঘাত যা থেকে মুক্ত নয় আপাত সংস্কারত্যাগী বৈষ্ণবরাও।
তাঁর রচিত অকল্পিত গল্পে তিনি দেখান, “যারা রাষ্ট্রদেবতার মন্দিরের কাছাকাছি থাকেন, যারা বিশ্ব মানচিত্রে নিজের ক্ষুদ্র অবস্থান সম্পর্কে বেশ সচেতনই বলা চলে, যারা দেখতে পায় কিংবা দেখেও না দেখার ভান করে আমাদের চারিদিকে চাপা কান্নার শব্দ, আমাদের চারিদিকে জীবনের হীনতম উদাহারণ, খাদ্যের অভাবে, শিক্ষার অভাবে কুৎসিত ব্যারামের ছড়াছড়ি, মানুষ হয়ে পশুর জীবন-যাপন। আমাদের চারিদিকে অবরুদ্ধ নিশ্বাস, কোটি কোটি ভয়ার্ত চোখ, তারা যেন খুনের অপরাধে অপরাধী একপাল মানুষ”।
প্রত্যাবর্তন গল্পে তিনি গাঁয়ের কথা বলেন, “পঁচিশ বছর আগের পুরুষরা একদিন আকাশের দিকে চাহিয়া নিরুপায়ে কাঁদিয়াছে, তার বংশধরেরা আজও কাঁদিতেছে। তাহাদের চোখ-মুখ ফুলিয়া গেল”।
সোমেন চন্দ জীবনের এই স্বল্প পরিসরে শেষের কয়েকটি বছর সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন । প্রতিটি রচনাতেই রয়েছে সৃষ্টিশীলতার ছাপ। তাঁর ‘ইঁদুর’ গল্প বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
‘ইঁদুর’ গল্প প্রসঙ্গে লেখক হুমায়ূন আহমেদ বলেন, “সোমেন চন্দের লেখা অসাধারণ ছোটগল্প ‘ইঁদুর’ পড়ার পর নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে গল্প লেখার একটা সুতীব্র ইচ্ছা হয়। নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার ও মনসুবিজন নামে তিনটি আলাদা গল্প প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লিখে ফেলি”।
১৯৪০-এ প্রকাশিত সংঘের সংকলন ‘ক্রান্তি’-তে তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘বনস্পতি’ প্রকাশিত হওয়া ছিল বিরল ঘটনা। মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি ভাল একটি উপন্যাসও লিখেছিলেন, নাম – ‘বন্যা’। কিন্তু জীবিতাবস্থায় তাঁর কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি।
সোমেন চন্দের ‘উৎসব’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় সিলেট থেকে প্রকাশিত ১৩৪৮ সালের ‘স্মৃতি’র শরৎ সংখ্যায়। ‘স্মৃতি’র সম্পাদক ছিলেন জীতেশমাধব দত্ত ও হিরণ্ময় দাশগুপ্ত। ‘স্মৃতি’র ১৩৪৮ সালের শারদীয় সংখ্যায় লেখকমণ্ডলীতে সোমেন চন্দ ছাড়াও ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, সুরেন্দ্র মৈত্র, অজয় ভট্টাচার্য, গোপাল ভৌমিক, জগদীশ ভট্টাচার্য, বরদা দত্তরায়, সত্যভূষণ চৌধুরী, নরেন্দ্রচন্দ্র দেব, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, বিনোদবিহারী চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, জীতেশমাধব দত্ত ও রবীন্দ্র চৌধুরী। লেখকসূচি থেকেই ‘স্মৃতি’র উচ্চমান সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কলকাতার জাতীয় শিক্ষা পরিষদ পাঠাগারের যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য সংগ্রহশালায় ‘স্মৃতি’ সাময়িকীটি পাওয়া যায়।
সোমেন চন্দ সাহিত্যেও বিপ্লবের স্রোতধারা আশা করতেন। বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য দ্বারা ঘুণেধরা সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন করার অনুপ্রেরণা মানুষের মধ্যে সঞ্চার করা সম্ভব। আর সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মানুষের মুক্তির কথা চেতনায় ধারণ করে রচনা করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের কথাশিল্প।
তথ্য ও ছবিসূত্র:
১। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের লেখক শহীদ সোমেন চন্দ: সম্পাদনা-সাধন চট্টোপাধ্যায় ও সিদ্ধার্থরঞ্জন চৌধুরি। প্রকাশক: উবুদশ, কলকাতা। প্রকাশকাল-২০ ডিসেম্বর, ১৯৯৯।
২। সোমেন চন্দ: হায়াৎ মামুদ। প্রকাশক: বাংলা একাডেমী, ঢাকা। প্রকাশকাল- ২২ ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৭।
৩। সোমেন চন্দ রচনাসমগ্র: ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ। প্রকাশক- কথা প্রকাশ, ঢাকা। প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা ২০১০।
৪। সোমেন চন্দ: শিক্ষা ও সাহিত্য টিচার’স জার্নাল (নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির পত্রিকা, খন্ড – ৭৫, এপ্রিল-১৯৯৬, কলকাতা): সম্পাদক-অজিত বাগ।
লেখক: রফিকুল ইসলাম (শেখ রফিক)