১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে বড় ছেলে ড. সেলিম কারাগারে বাবা এম. মুনসুর আলীর সাথে দেখা করতে এলেন। কোলে তাঁর ছোট্ট ছেলে রিপন। এম. মনসুর আলীর আদরের নাতি রিপন। এই নাতিকে দেখতেই ১৯৭৪ সালে প্রথম লন্ডন গিয়েছিলেন তিনি। আজ নাতি তাঁকে দেখতে এসেছে কারাগারে। সাক্ষাতের নির্ধারিত সময় শেষে চলে আসছেন ড. সেলিম। হঠাৎ কেমন অদ্ভুতভাবে, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি, তাঁর ছোট্ট নাতির মুখের দিকে। এক সময় ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে থাকেন রিপনকে। হঠাৎ এত আবেগ তাঁকে পেয়ে বসেছিল কেন? তিনি তো এমন না। তবে কি মনের কোণে উঁকি দিয়েছিল- “এই দেখা শেষ দেখা?”…
হ্যাঁ ছোট্ট নাতির সঙ্গে এই দেখাই ছিল তাঁর শেষ দেখা। এরপর আর কোনোদিন নাতির সঙ্গে দেখা হয় নি তাঁর। কারণ ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাত্রিতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সূচনা হয় বর্বরতার নব্য উপাখ্যানের। এই রাতেই বঙ্গভবনের নির্দেশে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে অস্ত্রধারী সৈন্য। ডি.আই.জি এবং আই.জি প্রিজনের উপস্থিতিতে নিউ জেল বিল্ডিং-এর ৩নম্বর রুম থেকে এম. মনসুরকে নিয়ে আসা হয় অন্য ৪ নেতার কাছে ১নম্বর রুমে। আসার আগে ট্রাঙ্ক খুলে ধোয়া পাঞ্জাবী পরেন তিনি। এরপর একই রুমে সমবেত ৪ নেতাকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলি আর বেয়োনেট চার্চ করে হত্যা করা হয়। আবার শোক ও বিস্ময়ে বিমূঢ় হয় দেশবাসী। ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর শুনে তিনি সন্তানদের বলেছিলেন- ‘তোমাদের আজ অগ্নি পরীক্ষা, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।’ আর তিনি নিজেও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন। মৃতকে কখনই তিনি ভয় পাননি। তিনি বীর। মৃত্যুকে ভয় করা তাঁকে মানায়না।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যখন শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন তখন আন্দোলন পরিচালনা অবিশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কে, কারা তুলে নেবেন এ কন্টক লাগাম? আবির্ভাব ঘটে দীর্ঘ দিন বাঙালীর আন্দোলন-সংগ্রামে দায়িত্ব পালনকারী ৪ জাতীয় নেতার। যাঁরা গঠন করেন বিপ্লবী সরকার। চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন বাঙ্গালীর মুক্তি সংগ্রামকে একটি নির্দিষ্ট রাস্তা অভিমুখে। ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ৪ জাতীয় নেতার ১ জন। ত্যাগী ও কঠিন সময়ে কঠিন দায়িত্ব পালনকারী, মুক্তিযুদ্ধের সংকটময় সময়ে জাতির সামনে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখার কর্তব্য পালনকারী ও ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী তাই বাঙ্গালী জাতির গৌরব।যমুনার ঘোলা পানিতে যেখানে নৌকা বায় মাঝি, মাছ ধরে জেলে, পাড়ের সবুজ গ্রামে ফসল ফলায় কৃষক, আর ছুটে-ছুটে খেলা করে দুরন্ত বালক-বালিকা এমনি এক গ্রাম সিরাজগঞ্জ জেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের ‘কুড়িপাড়া’। এখানেই ১৯১৯ সালের ১৬ জানুয়ারী হরফ আলী সরকারের ঘরে জন্ম নেয় এক ছোট্ট শিশু। সহজ সরল মুখের শিশুটির নাম রাখা হয় মনসুর আলী। পরিবারের ৪ ভাই, ১ বোনের ছোট মনসুর তাঁর সরলতা, শিশুসুলভ কোমল ব্যবহারে বিমোহিত করত সবাইকে।পড়াশুনা শুরু করেন কাজিপুরের গান্ধাইল হাই স্কুলে। এরপর চলে আসেন সিরাজগঞ্জ বি.এল, হাইস্কুলে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এখান থেকেই। এরপর চলে যান পাবনা। ভর্তি হন এডওয়ার্ড কলেজে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন এই কলেজ থেকেই। শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় জায়গির থেকে পড়াশুনা করেছেন মনসুর আলী । উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর ১৯৪১ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন । এরপর ভর্তি হন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নাম করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯৪৫ সালে এখান থেকেই অর্থনীতিতে এম.এ এবং ‘ল’ পাস করেন। এল.এল.বি- তে প্রথম শ্রেণী লাভ তিনি।১৯৪৪ সালে গাইবান্ধার পলাশ বাড়ীর আমির উদ্দিন সরকারের ৭ কন্যা ও ৫ পুত্র সন্তানের ১ কন্যা আমেনা খাতুনকে বিয়ে করেন মনসুর আলী । তাঁর শ্বশুর ছিলেন মুন্সেফ। তিনি চাইতেন জামাই চাকুরী করুক। জজ হোক। কিন্তু তিনি চাকুরী করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি স্বাধীন পেশা ওকালতিকেই পরবর্তীতে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৮৫১ সালে আইন ব্যবসা শুরু করেন পাবনা জেলা আদালতে। আইনজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যক্তি। পাবনা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন তিনি।আলীগড় থেকে দেশে ফেরার পর তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতির সাথে। মুসলিম লীগের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এই নবীন আত্মসচেতন ব্যক্তি। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ছিলেন পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি।
১৯৪৮ সালে তিনি যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণ নেন এবং পিএলজি-এর ক্যাপ্টেন পদে অধিষ্ঠিত হন। এ সময় থেকেই তিনি ক্যাপ্টেন মনসুর নামে পরিচিত হতে থাকেন।ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় তিনি শেখ মুজিবর রহমানের সাথে পরিচিত হন। তাঁদের মাঝে সহজ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কলকাতা থেকে দেশে ফেরার পর স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আমজাদ হোসেন, আব্দুর রব বগা মিঞা, জনাব আমিন উদ্দিন অ্যাডভোকেট প্রমুখের সাথে তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। সেইসাথে বাড়তে থাকে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব। ১৯৫১ সালে তিনি আওয়ামী-মুসলীম লীগে যোগ দেন। জড়িয়ে পড়েন সক্রিয় রাজনীতিতে। আওয়ামী মুসলীম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন এবং দলের পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। সময়ের পরিক্রমায় চলে আসে ১৯৫২ সাল। সারা দেশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্ফুলিংগ। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের দাবীতে আন্দোলন-সংগ্রামে মেতে ওঠে দেশ। পাবনা শহরেও সে সংগ্রামের ঢেউ লাগে। শহরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এম. মনসুর আলী। ফলস্বরূপ কারা নির্যাতন। গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। পরবর্তীতে মুক্ত হন।১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে পাবনা-১ আসনের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আব্দুল্লাহ্ আল মাহ্মুদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন তিনি। এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন মনসুর আলী । আব্দুল্লাহ্ আল মাহ্মুদের জামানত বাজেয়প্ত হয়ে যায়। এরপর যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে যায়। ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় পূর্ববঙ্গ কোয়ালিশন সরকারের আইন ও সংসদ বিষয়ক, খাদ্য ও কৃষি এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন তিনি।১৯৫৮ সালে দেশে জারি হয় সামরিক শাসন। তিনি নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন।
কারা নির্যাতন ভোগের পর মুক্ত হন, ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে। বাঙালীর মুক্তির সনদ ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।তিনি সপরিবারে বসবাস করতেন পাবনা শহরে। কিন্তু রাজনীতিতে সক্রিয় হবার কারণে এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করার জন্য তাঁকে মাঝে মাঝেই ঢাকা আসতে হতো। ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচন করেন। পাবনা-১ আসন থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।এরপর এল বাঙ্গালীর উপর পশ্চিম পাকিস্তানি বর্বরদের নিধনযজ্ঞের সেই কালো রাত ২৫ মার্চ । গ্রেফতার হলেন বঙ্গবন্ধু । মনসুর আলী গ্রেফতার এড়াতে চলে যান সোবহানবাগ কালোনীতে তাঁর ভাতিজা আফ্জাল হোসেনের বাসায়, যিনি একজন সরকারী কর্মচারী ছিলেন। এখান থেকে তিনি কেরানীগঞ্জ হয়ে কুড়ি পাড়া যান তাঁর পরিবারের সাথে দেখা করতে। এরপর চলে যান ভারতে। আসামের মাইনকার চর হয়ে তিনি কলকাতা গমন করেন। ভারতে আশ্রয় নেয়া অন্য নেতাদের সাথে দেখা ও যোগাযোগ হয় তাঁর। এরপর দলীয় হাই কমান্ডের অন্য নেতারা মিলে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে গঠন করেন মুজিবনগর সরকার। নতুন গঠিত সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এবছরের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর পরিবারও কলকাতা গিয়ে পৌঁছে। তিনি সপরিবারে বসবাস করতে থাকেন পার্কসার্কসের সিআইটি রোড়ের বাড়িতে। তাঁর অফিস ছিল ৮নং থিয়েটার রোডে। সম্মিলিতভাবে সংগঠিত করতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধ। এসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু রাখা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজতে থাকেন তিনি।দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নিল স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ। এরপর দেশে ফিরে আসেন মনসুর আলী। আর জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২-এর জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানি কারাগার থেকে দেশে ফিরে মন্ত্রী পরিষদ পুনর্গঠন করেন। এবার মনসুর আলী দায়িত্ব নেন প্রথমে যোগাযোগ ও পরে স্বরাষ্ট্র এবং যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে। যুদ্ধ বিধ্বংস্ত বাংলাদেশ। সারা দেশে বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধে, বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা। তিনি দক্ষ তত্পরতায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। হার্ডিঞ্জ ব্রীজ তৈরীতে রাখেন ভূমিকা।
১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচনে মনসুর আলী পুনরায় পাবনা-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ বছর তিনি আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টরী দলের সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু দেশ তখন নতুন এক সমস্যার মুখোমুখি হয়। সারাদেশে চাটুকার, সুবিধাভোগী লুটেরাদের দৌরাত্ম্যে দেশ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়। দেশের অর্থনৈতিক ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পরে। এরকম অবস্থায় সারাদেশকে একটি সংঘবদ্ধ একক কাঠামোয় রূপদানের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান সকল দলকে একত্রিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি চালু করেন। এ সময় ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মনসুর আলী বঙ্গবন্ধু মন্ত্রীসভার প্রধান মন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক গঠিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) সেক্রেটারী জেনারেলও ছিলেন এ সময় ক্যাপ্টেন মনসুর। সময় ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী।যুদ্ধ পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়তে বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা হিসেবে ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ব্যাপক অবদান রাখেন। তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন রাজধানী ঢাকার সাথে সিরাজগঞ্জের সুষ্ঠু যোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এলেঙ্গা ভূয়াপুর ঘাট পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন। তিনি সিরাজগঞ্জের ভূয়াপুর ঘাটে উন্নতমানের ফেরী সার্ভিস চালু করেন। তাঁর জন্মস্থান কাজীপুরের রাস্তা পাকা করার ব্যাপারেও ভূমিকা রাখেন।মন্ত্রী থাকার সময় তিনি কখনও ক্ষমতার দম্ভে দাম্ভিক হয়ে ওঠেননি। ছিলেন অত্যন্ত বিনীয়। অমায়িক ও চকত্কার ব্যবহার ছিল তাঁর। বিরোধী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সম্পর্কেও কোন কটুক্তি করতেন না। শত ব্যস্ততার মাঝেও আত্মীয়-স্বজন এবং দলীয় লোকজনের সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। মন্ত্রী থাকাকালীন একবার তিনি কাজিপুরের পাড়াগায়ে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় কাজে। হঠাৎ তিনি হাঁটতে শুরু করেন। ছোট গ্রামের মাঝের এক বাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হন। কদমবুচি করেন এক প্রৌঢ়কে। তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেন সেই প্রৌঢ়।
পরে জানা যায় ব্যক্তিটি ছিলেন তাঁর শিক্ষক। শিক্ষককে সম্মান করেছেন সব সময়। তিনি যখন যোগাযোগ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন উত্তর বঙ্গের অনেক মানুষকে রেলওয়ে এবং পুলিশ বিভাগে চাকুরী দিয়ে তাদের পরিবারের উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।পিতা হিসেবেও তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল। ব্যস্ততার কারণে তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদেরকে খুব সময় দিতে না পারলেও স্ত্রীর কাছে থেকে সন্তানদের লেখাপড়া ও অন্যান্য বিষয়ে খোঁজ খবর নিতেন। তিনি যখন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তখনও তিনি অত্যন্ত সরল জীবন-যাপন করতেন। প্রায়ই জোরে জোরে গাইতেন জাতীয় সংগীত এর কয়েক লাইন “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”। এই গানটি ছিল তাঁর খুব প্রিয় একটি গান। কারণ এই দেশকে ভালোবালবেসেই তো ১৯৭১-এ দেশ স্বাধীনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।চলছিল সবকিছুই। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট সামরিক বাহিনীর উচ্ছৃংখল ও উচ্চাভিলাষী কিছু বিপথগামী সেনার হাতে দেশী-বিদেশী চক্রান্তের শিকার হয়ে শাহাদত বরণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এসময় এম. মনসুর আলী ছিলেন তাঁর ৩০ হেয়ার রোডের বাসায়। মুজিব হত্যার খবর তাঁকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দেয়। শেখ মুজিবকে হত্যার পর তাঁকে গৃহবন্দী করা হয় । এরপর ২৩ আগষ্ট মোশতাক সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন তিনি। গ্রেফতারের পূর্বে মোশতাক সরকারের প্রতিনিধি ওবায়দুর রহমান, শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং নুরুল ইসলাম মঞ্জু তাঁকে মুশতাক মন্ত্রী সভার প্রধান মন্ত্রী হিসেবে যোগদেবার অনুরোধ জানায়। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।মুশতাক সরকারের অভিলাষ সিদ্ধ হয় না। জাতীয় নেতারা মুশতাক সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর মনসুর আলীসহ চার জাতীয় নেতাকে আটক রাখা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিউ জেল বিল্ডিং-এ এবং এরপর তাঁকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাত্রিতে অন্য চার জাতীয় নেতার সাথে হত্যা করা হয়।হত্যার ২ দিন পর তাঁর মৃতদেহ তুলে দেওয়া হয় পরিবারের কাছে। ধানমন্ডির ১৯ নম্বর রোডে তাঁর স্ত্রীর বোনের বাসায় মৃতদেহ নিয়ে আসা হয়। দাফন করা হয়। কিন্তু যে আশা আকাংখা আর স্বপ্নের বীজ তিনি রোপন করেছেন দেশের মানুষের হৃদয় জমিনে তাকে তো দাফন করা যায়না। তা বিকোশিত হবে আপন ইচ্ছায়। ফুটবে ফুল। মেলবে ডানা।
সংক্ষিপ্ত জীবনী : জন্ম: ১৯১৯ সালের ১৬ জানুয়ারী।
জন্মস্থান: সিরাজগঞ্জ জেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের কুড়িপাড়া।
বাবা: হরফ আলী সরকার।পড়াশুনা: পড়াশুনা শুরু করেন কাজিপুরের গান্ধাইল হাই স্কুলে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন এডওয়ার্ড কলেজ থেকে। শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় জায়গির থেকে পড়াশুনা করেছেন মনসুর আলী । উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর ১৯৪১ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন । এরপর ভর্তি হন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নাম করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯৪৫ সালে এখান থেকেই অর্থনীতিতে এম.এ এবং ‘ল’ পাস করেন। এল.এল.বি- তে প্রথম শ্রেণী লাভ।পেশা : তিনি স্বাধীন পেশা ওকালতিকেই পরবর্তীতে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৮৫১ সালে আইন ব্যবসা শুরু করেন পাবনা জেলা আদালতে। আইনজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যক্তি। পাবনা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন তিনি।রাজনীতি: আলীগড় থেকে দেশে ফেরার পর তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতির সাথে। মুসলিম লীগের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এই নবীন আত্মসচেতন ব্যক্তি। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ছিলেন পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি। ১৯৪৮ সালে তিনি যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণ নেন এবং পিএলজি-এর ক্যাপ্টেন পদে অধিষ্ঠিত হন। এ সময় থেকেই তিনি ক্যাপ্টেন মনসুর নামে পরিচিত হতে থাকেন। ১৯৫১ সালে তিনি আওয়ামী-মুসলীম লীগে যোগ দেন। জড়িয়ে পড়েন সক্রিয় রাজনীতিতে। আওয়ামী মুসলীম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন এবং দলের পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় পূর্ববঙ্গ কোয়ালিশন সরকারের আইন ও সংসদ বিষয়ক, খাদ্য ও কৃষি এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন তিনি। ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচন করেন। পাবনা-১ আসন থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচনে মনসুর আলী পুনরায় পাবনা-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ বছর তিনি আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টরী দলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক গঠিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) সেক্রেটারী জেনারেলও ছিলেন এ সময় ক্যাপ্টেন মনসুর।মৃত্যু: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাত্রিতে অন্য চার জাতীয় নেতার সাথে তাঁকে হত্যা করা হয়।
মোঃ রাজিত আলম পুলক