পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে বরাবরই বাঙালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে গর্বিত ছিলেন তিনি। অনেকটাই খোলামেলা ভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তথা ছয় দফা দাবীর বিষয়ে কথা বলতেন তিনি। এ জন্য পাক-সেনারা তাঁকে ‘ভাসানী’ বলে ডাকতো। এমনও হয়েছে, একবার তাঁকে এক পাঞ্জাবি সেনা কর্মকর্তা ‘এই বাঙালী, ইধারমে আও’ বলে ডেকেছে, আর সাথে সাথেই তিনি গিয়ে সেই কর্মকর্তাকে একটা চড় মেরে বলেছেন, ‘আমার অস্তিত্বকে তিরস্কার করো না, আমার একটি নাম আছে।’ পরবর্তীতে এ জন্য তাঁকে কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি পর্যন্ত হতে হয়, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে যৌক্তিক অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯৭১ সালে এই অকুতোভয়, নির্ভীক, বীর সেনানী নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন এ মাটির জন্য, আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের জন্য, তিনি শহীদ লে. কর্ণেল মোহাম্মাদ আব্দুল কাদির।
মোহাম্মাদ আব্দুল কাদিরের জন্ম ১৯২৯ সালের ২ জানুয়ারী রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে। বাবা মোহাম্মাদ আব্দুল হোসেন, একজন অবস্থাপন্ন গৃহস্ত এবং মাতা বেগম আসতুন্নেছা একজন গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে আব্দুল কাদির ছিলেন দ্বিতীয়।
ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলেন আব্দুল কাদির। রংপুর জিলা স্কুল থেকে প্রথমে ম্যাট্রিক এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করেন তিনি। পরবর্তীতে গ্রাজুয়েশন শেষ করে বুয়েট (বর্তমান) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউওটিসি’র একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তৎকালীন ইউওটিসি’র অধিনায়কের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৪৭ সালের পর পরই তিনি তৎকালীন পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীর ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেনেন্ট হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন এবং ১৯৬২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াতে ইঞ্জিনিয়ার অফিসারস ক্যারিয়ার কোর্স-৩ সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬৬ সালে লেফটেনেন্ট কর্ণেল পদে পদোন্নতি পান। লে. কর্ণেল হিসেবে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেনা সদর ইঞ্জিনিয়ার পরিদপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার-১ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি থেকে তৎকালীন অয়েল এন্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান হিসেবে চট্টগ্রামে বদলী হয়ে আসেন।
লে. কর্ণেল আব্দুল কাদির ১৯৫৫ সালের ১২ জুলাই বিয়ে করেন রংপুরের হাসনা হেনা কাদিরকে। এক মেয়ে ও দুই ছেলের পিতা আব্দুল কাদির তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলেটিকে দেখে যেতে পারেননি। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর সামনে থেকেই পাক সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়।
৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যেদিন রেডিওতে প্রচার হয়, সেদিন তিনি ভীষণ খুশী হয়েছিলেন এবং বার বার তাঁর পরিবারকে বলছিলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এবার আমরা স্বাধীন হবো।’ এরপর একদিন, তিনি তাঁর সন্তানদের জন্য স্বাধীন বাংলার একটি বড় পতাকা কিনে আনেন এবং সেটি বাঁশ পুঁতে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের কোয়ার্টারে লাগিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, নিজের গাড়িতেও লাগাতে শুরু করেছিলেন স্বাধীন বাংলার ছোট একটি পতাকা। এছাড়া, তাঁর অফিসেও তিনি নুরুল ইসলামসহ অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। তখন অনেকে তাঁকে বলেছেন, ‘কর্ণেল সাহেব, আপনি যে এসব করছেন, দেখবেন শিগগিরই হয়তো আপনার বিপদ হবে।’ কিন্তু তিনি এ সবের তোয়াক্কা করেননি একটুও। আব্দুল কাদির ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক বাঙালী। চট্টগ্রামে আসার পরে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত সামরিক বেসামরিক অফিসারদের সাথে গোপনে সম্পর্ক স্থাপন করেন। সে সময় পূর্ব পাকিস্তান তেল-গ্যাস উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক (অপারেশন) পদে থাকাকালীন কাদির শহীদ জাতীয় নেতা কামরুজ্জামানকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান কীভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অসহযোগিতা করছে, তা তিনি বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। আর তেল-গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানের জন্য যে সব বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয়, প্রচুর পরিমাণে এ সব বিস্ফোরক গোপনে সরবরাহ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযোদ্ধারা শোভাপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছিলেন এই বিস্ফোরক ব্যবহার করে।
২৭ মার্চ পুরো চট্টগ্রামের দখল নেয় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। সারারাত ভয়াবহ গোলাগুলির শব্দ চারদিকে। ৭-৮ এপ্রিলের দিকে আব্দুল কাদির বাসা থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যান। পরে ১৪ এপ্রিল বাসায় ফিরে তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘নাহ, বের হয়ে যেতে পারলাম না। সব রাস্তায় ওরা পাহারা বসিয়েছে। আমি কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে ফিরেছি।’ পরে জানা যায়, বাঙালী সেনা কর্মকর্তা মেজর রফিক, এমআর সিদ্দিকীসহ আরো কয়েকজনের সঙ্গে আব্দুল কাদির পরিকল্পনা করেছিলেন, প্রত্যেকের বাড়িতে দুটি করে গাড়ি পাঠানো হবে। একটিতে করে সব বিদ্রোহী অফিসারসহ অন্য বাঙালী সেনা কর্মকর্তারা সরে পরে কোনো একটি গোপন স্থানে জড়ো হবেন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করবেন। আর অন্যটিতে করে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কোনো কারণে এই গাড়িগুলো আর আসেনি।
এরপর কাদির পরিবারের সামনে আসে সেই ভয়াল দিন। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লে. কর্ণেল আব্দুল কাদিরের বড় ছেলে বিশিষ্ট সাংবাদিক নাদীম কাদির বলেন, “১৭ এপ্রিল সকালে পাঁচলাইশের দোতলা বাসায় বাবা নাস্তা সেরে নিজের শোবার ঘরে বসে আছেন। আমি, মা আর আমার বড় বোন নাস্তা খাচ্ছি। এমন সময় বাসার দরজায় জোরে জোরে ধুম-ধাম ঘা পড়তে লাগলো। আমাদের দুজন স্টাফ জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েই মাকে জানালো, আর্মি এসেছে। আমি গিয়ে বাবাকে বললাম, ‘আমি কি দরজা খুলে দেবো?’ বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ, খুলে দাও।’ দরজা খুলে দিতেই একজন পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন ও কয়েকজন সৈনিক বন্দুক উঁচিয়ে ঘরে ঘরে ঢুকে পড়লো। তারা সরাসরি শোবার ঘরে ঢুকে বললো, ‘ইউ আর আন্ডার এরেস্ট!’ বাবা তাঁর প্রিয় শার্ট-প্যান্ট পড়ে তৈরি হয়ে নিলেন। ঘড়িটি হাতে নিলেন, মানিব্যাগ পকেটে পুরলেন। চলে যাওয়ার সময় মাকে বললেন, ‘নিজের ও বাচ্চাদের দিকে খেয়াল রেখো।’ আমার ছোট ভাইটি তখন মার পেটে।”
নাদীম কাদির আরও বলে চলেন, ‘পাক সেনারা যখন বাবাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তখন আমি পিছু পিছু সিঁড়ি পর্যন্ত ছুটে যাই। সিঁড়ি বারান্দার জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি, বাবাকে বন্দুকের মুখে সেনাবাহিনীর জিপে তোলা হচ্ছে। গাড়িতে ওঠার আগে বাবা একবার মাথা উঁচিয়ে তাকালেন, আমাদের বাসার দিকে। তিনি আমাকে দেখলেনও। আমি তাঁকে দেখে হাত নাড়লাম। জবাবে তিনিও একবার হাত নাড়লেন। সেটাই আমার বাবাকে শেষ দেখা।’
তিনি স্মৃতিচারণ করে আরও বলেন, “১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সকালে আমাদের চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের বাসা থেকে পাকিস্তানী সেনারা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমরা সেনানিবাসে তাঁর খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁর কোনো খবরই পাওয়া যাচ্ছিলো না। এর কয়েক ঘন্টা পর পাকসেনার এক ক্যাপ্টেন কয়েকজন সৈনিকসহ বন্দুক উঁচিয়ে আমাদের বাসায় আসে। তারা মা’র (হাসনা হেনা কাদির) কাছে জানতে চায়, আমার বাবার বন্দুকটি কোথায়? তিনি তাঁকে বন্দুকটি এনে দেন। এর পর সেই ক্যাপ্টেন বার বার মাকে বলেন, ‘কর্ণেল সাহেবের পিস্তল কোথায়? সেটি আপনি কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?’ মা বরাবরই অস্বীকার করেন, বাবার কোনো সার্ভিস-পিস্তল ছিলো না। কিন্তু ক্যাপ্টেন এ কথা বিশ্বাস করে না। সে মাকে বলে, জিজ্ঞাসাবাদে বাবা নাকি তাদের জানিয়েছে, তাঁর একটি পিস্তলও আছে।
বাদানুবাদের এক পর্যায়ে ক্যাপ্টেনের আদেশে মা, আমার চেয়ে সামান্য বড় বোন ও আমাকে লাইন-আপ করা হলো। সৈনিকরা আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে দাঁড়ালো। ক্যাপ্টেনটি হুমকি দিয়ে মাকে বললো, ‘জলদি বলুন, পিস্তল কোথায়? নইলে সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলবো।’ আমার মা একটুও ভয় না পেয়ে তাদের বললেন, ‘মারতে হয় আমাকে মারো। কিন্তু খবরদার! বাচ্চাদের গায়ে কেউ হাত দেবে না!’
ক্যাপ্টেনটি একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘নাহ। আপনাকে খুন করা ঠিক হবে না। কারণ আপনি গর্ভবতী।’ (সে সময় আমার ছোট ভাই মার পেটে)। পরে সে সৈনিকদের নিয়ে মার শোবার ঘরে ঢোকে। মাকে স্টিলের আলমারি খুলে গহনাগাঁটি, টাকাপয়সা – যা কিছু ছিলো, সব দিয়ে দিতে বলে। মা আলমারী খুলে সব তাদের দিয়ে দেন। তারা যখন চলে যাচ্ছিলো, তখন আমি ক্যাপ্টেনের কাছে জানতে চাইলাম, ‘আঙ্কেল, আমার বাবা কবে বাসায় আসবেন?’ ক্যাপ্টেন অনেকক্ষণ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর বললো, ‘আ জায়গা। ফিকর মাত করো।’
এদিকে বাবার অফিসের গার্ড এসে মাকে বললেন, ‘আমি খবর নিয়ে জেনেছি, স্যারকে মেরে ফেলা হয়েছে।’ কিন্তু মা তাঁর কথা বিশ্বাস করেননি।”
সাংবাদিক নাদীম কাদির যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরও বলেন, ‘এমনই এক পরিস্থিতিতে আমার মা বুঝতে পারছিলেন, ওই বাসায় থাকলে হয়তো একদিন আমরাও সবাই মারা পড়বো। মা বাসা থেকে পালানোর একটা উপায় খুঁজছিলেন। প্রতিবেশীর একটি গাড়ি পেয়ে তিনি আমাদের নিয়ে বাবার পরিচিত একজনের বাসায় আশ্রয় নেন। কিন্তু তিনি পাক-সেনাদের টেলিফোন করে জানিয়ে দেন যে, কর্ণেল কাদিরের স্ত্রী ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে তার বাসায় উঠেছে। এমন অবস্থায় আমার মা কাঁদতে শুরু করেন। এদিকে কারফিউ শিথিল হলে সম্পর্কে চাচা রহুল আমিন বাবার গ্রেফতারের খবর পেয়ে আমাদের খোঁজ করতে এসে জানতে পারেন, আমরা কোথায় আছি। তখনই তিনি একটি গাড়ি জোগাড় করে সেখানে এসে চট করে আমাদের নিয়ে সরে পড়েন। পরে আমরা বহুদিন তাঁর বাসায় লুকিয়ে থেকেছি। তাঁরই সহায়তায় ছদ্মনামে মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই আমাদের ছোট ভাইটি জন্মায়। মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী বলে মা হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স সকলের বিশেষ সেবা পেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর আমরা চট্টগ্রামের পাট চুকিয়ে দিয়ে ঢাকায় চলে আসি। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আমরা জানতে পারিনি, আমার বাবা আদৌ বেঁচে আছেন কী না? অথবা কী ঘটেছে তাঁর ভাগ্যে?”
স্বাধীনতার পর পরই রেড ক্রিসেন্ট তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানের সূত্র ধরে লে. কর্ণেল আব্দুল কাদিরের পরিবারকে জানিয়েছিলো, “কর্ণেল কাদির ওয়াজ কিল্ড ইন অ্যাকশন।” কিন্তু তারা এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। ১৯৯৯ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর স্ত্রী হাসনা হেনা কাদির কোনদিনই বিশ্বাস করেননি যে, তাঁর স্বামীকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। তিনি বলতেন, ‘আগে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ পাই, তারপর না হয় বিশ্বাস করবো।’
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ আনুমানিক সকাল নয়টার দিকে একজন পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর একটি ছোট্ট দল লে. কর্ণেল মোহাম্মাদ আব্দুল কাদিরকে তাঁর নিজস্ব বাসভবন থেকে চট্টগ্রামস্থ সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং এরপর তিনি আর কোনদিনই ফিরে আসেননি। ধারণা করা হয়, স্বাধীনতাকামী সামরিক অফিসারদের সাথে তাঁর গোপন যোগাযোগের খবর পাক সেনাবাহিনী জানতে পারে এবং সেই অপরাধেই তাঁকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে নাদীম কাদির স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনা করে ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে জানতে পারেন, লে. কর্ণেল কাদিরকে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে গুলি করে হত্যার পর মাটি চাপা দেয়া হয় আরও সতেরো জনের সাথে।
স্বাধীনতার পর ১৯৮৩ সালে দেশমাতার স্বাধীনতার জন্য তাঁর আত্মোৎসর্গের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তৎকালীন সরকার নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলাস্থ দয়ারামপুর সেনানিবাস-এর নাম পরিবর্তন করে “কাদিরাবাদ সেনানিবাস” করে, যা ইঞ্জিনিয়ার সেন্টার ও স্কুল অফ মিলিটারী ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে সমাধিক পরিচিত। তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে এই সেনানিবাসে হোম অব স্যাপার্স নামে একটি স্মৃতিসৌধও নির্মাণ করা হয়। সরকার তাঁকে শহীদ বুদ্ধিজীবি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং তাঁর নামে একটি ডাকটিকেট চালু করে।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে অনেক খোঁজাখুজি করে ২০০৭ সালে শহীদ লে. কর্ণেল এম এ কাদিরের বড় ছেলে সাংবাদিক নাদীম কাদির চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে তাঁর বাবার কবরস্থান চিহ্নিত করেন। পরবর্তীতে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ও সরকারের নির্দেশে ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে তাঁর দেহাবশেষ সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম থেকে নাটোরের দয়ারামপুরে অবস্থিত কাদিরাবাদ সেনানিবাসে নিয়ে আসা হয়। বেলা তিনটার দিকে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্ণেল মোহাম্মদ আব্দুল কাদিরের দেহাবশেষ হোম অব স্যাপার্সে নির্মিত স্মৃতিসৌধের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত করা হয়।
তথ্যসুত্রঃ
১। হালিদা চৌধুরী-প্রাক্তন শিক্ষিকা, রংপুর সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও হাসনা হেনা কাদিরের বোন ২। বিপ্লব রহমান-সাংবাদিক, দৈনিক কালের কণ্ঠ ৩। রিয়াদ আনোয়ার শুভ- ফ্রিল্যান্সর সাংবাদিক, রংপুর।
লেখক : আতিকা বিনতে বাকী রোমা