কুড়িগ্রামের বীরাঙ্গনা তরুবালা কর্মকারের জীবনের গল্পটা জানার আগে তাঁর স্বামী নিশিকান্ত সূত্রধরের কথা আমাদের জানার দরকার।
কারণ, তরুবালা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে দুইভাবে নিঃশেষ করেছে। প্রথমত, তাঁর স্বামীকে কেড়ে নিয়েছে, দ্বিতীয়ত, তাঁকে পথে বসিয়ে সারাজীবনের জন্য সামাজিক অবহেলা আর লাঞ্ছনার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। ফলে তরুবালা কর্মকার যখন তাঁর জীবনের গল্পটা সেপ্টেম্বরের এক বৃষ্টির সকালে বলতে শুরু করেন, তখন তিনি শুরু করেন স্বামীর গল্প দিয়ে। কারণ, তরুবালা এখনো বিশ্বাস করেন, তাঁর সভ্রমের বিনিময়েও যদি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী স্বামীকে রেখে যেত তাহলে এ স্বাধীন দেশে তাঁকে মানুষের বাড়ি বাড়ি ‘ঠিকা ঝি’-এর কাজ করে খেতে হত না।
তরুবালার স্বামীর পুরো নাম নিশিকান্ত সূত্রধর। ‘সূত্রধর’ মানে যারা কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। নিশিকান্তর বাড়ির অবস্থা ভাল ছিল না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম পুরুষ তিনি, নিজের কোন জমি-জিরাতও ছিল না। বাড়ি ছিল চরাঞ্চল গোড়ারহাটের পোড়ারভিটেতে। সেই বাড়িতেই ‘না বোঝার’ বয়সে ‘গন্ডগোলের অনেক দিন আগে’ বউ হয়ে আসেন তরুবালা। তরুবালার কথায়, ‘তখন তো আমি কিচ্ছু বুঝি না। কাপড় পড়তে পারি না। রানতে-বাড়তে পারি না। পারি না বলে সোয়ামি বকাঝকা করে। তয়, হউর-হাউরি সমঝাই দিত।’
‘একলা একলাই মানুষটা কাম করত। কাঠের কাম করে তো আর বেশি আয় হইত না। মাঝে মাঝে ধরলায় মাছও মারত। মাইনষের বাইত মিস্ত্রির বান্ধা কাম করলে মাসে ৮-১০ টাকা আইত। আমিও চরে নানা জিনিস লাগাইতাম। হাউরি আর আমি মিলে হেইতা ঘরে তুলতাম। বাড়িঘর ভালা আছিল না ঠিক, তয় দুইবেলা ভাত খাইতে পারতাম। ভালাই আছিলাম হেইখানে।’ নিশ্বাস ছেড়ে বলেন কপালে তিলক করা তরুবালা।
তরুবালা আর নিশিকান্তের সেই ভিটে একদিন চলে যায় ধরলার গর্ভে। জমি তো আগে থেকেই ছিল না, এবার তারা ভিটেমাটি থেকেও উচ্ছেদ হন। সেটা মুক্তিযুদ্ধের বছর পাঁচেক আগের কথা। এক ছেলে আর দুই মেয়ে হয়েছে তখন, মারা গেছেন শ্বাশুড়ি। ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবারটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বুঝতে পারে না। আশপাশে আত্মীয়-স্বজন যারা ছিল তারা চলে গেছে যে যেদিকে পারে। বেশির ভাগই যায় ভারতে। তারাও তো আর সচ্ছল ছিল না যে, সাহায্য-সহযোগিতা করবে। ফলে নিশিকান্ত সূত্রধর একদিন পরিবারের সকলকে নিয়ে কুড়িগ্রাম শহরের পাশে পালাশবাড়িতে চলে আসেন। নিশিকান্তের আশা, আর কিছু না হোক শহরে অন্তত কাজ তো পাওয়া যাবে। তা কাজ তিনি ভালই করতেন এবং পেতেনও। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পরেই কুড়িগ্রাম শহর পাকিস্তানী সেনাদের দখলে চলে যায়। শহর ও আশপাশে অনেকগুলো ক্যাম্প স্থাপন করে তারা। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় এসব ক্যাম্পে নিয়ে আটক রেখে নির্যাতন করা হত এলাকার যুবক-যুবতীদের। কখনো কখনো পাকিস্তানী সেনারা টহলে বেরিয়ে এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালাত। শহর ছেড়ে অনেক মানুষ তখন নিরাপদ দূরে চরাঞ্চলে বা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যায়।
এ অবস্থায় এপ্রিলের এক দুপুর বেলা, তরুবালা বাড়ির উঠানে ভাত বসিয়েছেন। ছেলেমেয়েরা বাড়ির বাইরে খেলাধুলা করছে। শ্বশুর ঘরের ভিতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। চারদিকে যুদ্ধের দামামা, হাতে তেমন কোন কাজও ছিল না নিশিকান্তর। তিনিও ঘরের বারান্দায় বসা ছিলেন। এ সময়ে দিনমজুরি, কুলিগিরি ও অন্যান্য কাজ করে কোনভাবে দিনগুজরানের চেষ্টা করছেন। অনেকেই তাদের বলেছে, এখান থেকে চলে যেতে, যে কোনদিন যে কোন বিপদ হতে পারে। কিন্তু কোথায় যাবেন নিশিকান্ত তাঁর পরিবার নিয়ে! ঘর থেকে বের হওয়ার জন্যও যে পয়সা দরকার সেটাও তাঁর হাতে নেই।
‘ভাত তখন ফুটি ফুটি আসছে বুঝছেন বাহে, ঠিক তখনি বাড়ি ঘিরে ফেলছে মিলিটারিরা। এর আগেও আসছে। তখন তো চিৎকার-চেঁচামেচি শুনা যাইত। আমরা বাড়ি ছাইড়া চরের মধ্যে, জঙ্গলের মধ্যে লুকাইতাম। এই দিন আর কেউ কিছু বুঝতে পারি নাই।’ এ কথা বলেই নিঃশ্বাস ছাড়েন তরুবালা। যেন, তাঁর আর কিছুই করার ছিল না।
১০-১২ জন মিলিটারি বাড়িতে ঢুকে, তারমধ্যে ৩-৪ জন সোজা ঘরের ভিতরে ঢুকে যায়। পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে কয়েকজন স্থানীয় লোক। তারা উঠানে রাঁধতে থাকা তরুবালাকে কোন কথা জিজ্ঞেস করেননি, বারান্দায় বসে থাকা নিশিকান্তকেও কিছু বলেনি। কিন্তু মিলিটারি বন্দুক হাতে উঠানে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল যে, তারা কোন কথা বলতে পারছিলেন না; এমনকি জায়গা ছেড়ে উঠতেও সাহস পাচ্ছিলেন না। উঠানে বসা তরুবালা একবার শুধু মাথাটা তুলে বারান্দায় বসে থাকা স্বামী নিশিকান্তর দিকে মুখ তুলে তাকালেন।
কিছু পরেই ২ জন পাকিস্তানী মিলিটারি তরুবালার শ্বশুরকে টেনে-হিঁছড়ে ঘর থেকে তুলে এনে উঠানে ফেলে রাইফেলের বাট দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। নিশিকান্ত সেদিকে যেতে চাইলে একজন রাজাকার একটা কাঠের লাঠি দিয়ে তাঁর পিঠে আঘাত করে। নিশিকান্ত আবার বসে যান। তরুবালাও শ্বশুরের দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে একজন মিলিটারি তাঁর নাকের কাছে রাইফেলটা এগিয়ে ধরে। ঘরে তেমন কিছু ছিল না যদিও, তবুও তরুবালা দেখলেন, কয়েকজন রাজাকার ঘরের পুরনো কাপড়- চোপড়গুলো একসাথে বেঁধে নিয়েছে।
এ সময় পাকিস্তানী মিলিটারিদের একজন বারান্দায় এসে নিশিকান্তর সামনে দাঁড়ান। তিনি কিছু ইশারা করেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই একজন রাজাকার এসে তাঁকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। কিছু বুঝে উঠার আগেই একজন মিলিটারি এসে তরুবালারও চুলের মুঠি ধরে টানতে শুরু করে। তারপর দুজনকেই বাড়ি থেকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যায় মিলিটারি ও রাজাকাররা মিলে। উঠানের মাঝখানে অচেতন পড়ে থাকেন তরুবালার শ্বশুর। উনুনে চড়ানো ভাতও ততক্ষণে পুড়তে শুরু করেছে। এরমধ্যেই একজন রাজাকার এসে তাতে পানি ঠেলে দিয়ে আগুনটা নিভিয়ে লাথি মেরে হাঁড়িটা ফেলে দেন। নিশিকান্ত আর তরুবালাকে নিয়ে যাওয়া হল একটি গাড়িতে করে। গাড়িটি গিয়ে থামল বর্তমান কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কমপ্লেক্সের সামনে। তরুবালা জানতেন এটা পাকিস্তানী সেনাদের ক্যাম্প। ক্যাম্পের গেইটে এসে তরুবালা আর তাঁর স্বামীকে দু’দিকে নিয়ে যাওয়া হল। তরুবালাকে নিয়ে আটকে রাখা হল একটি ঘরে। সেখানে তিনি তাঁর মতো অনেক নারীর দেখা পেলেন। তখন দুপুরের রোদ পড়ে এসেছে। সকালেও কিছু খাননি, দুপুরের ‘বাড়’ ভাতও জোটেনি কপালে। ক্ষিধেয় ততক্ষণে তাঁর পেট জ্বলতে শুরু করেছে।
ক্যাম্পে প্রথম রাতের নির্যাতনের পর তরুবালা দু’দিন অজ্ঞান ছিলেন। দু’দিন পর ক্যাম্পের ভিতর যখন জ্ঞান ফিরে পান তখনও তিনি তাঁর স্বামীর কোন খবর পাননি, পরিবারের অন্য সদস্যদেরও কোন খোঁজ পাননি। তবে তরুবালার কক্ষের কয়েকজন নারী তাঁকে জানায়, যেদিন তাদেরকে ধরে নিয়ে আসা হয় সেই রাতেই অন্য অনেক লোকের সঙ্গে ক্যাম্প থেকে তাঁর স্বামীকেও ধরলার পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা তরুবালাকে আরো জানান, এদের অনেককে ধরলার পাড়ে নিয়ে গুলি করা হয়। কয়েকজনকে বাঁচিয়ে রাখা হয় সেইসব লাশ নদীতে ফেলার জন্য। পরে রাতে তাদেরকে আবার ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। তরুবালার শরীরে এমনিতেই কোন শক্তি ছিল না, এ কথা শুনার পর তিনি চিৎকার দিয়ে আবারো অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তিন দিনের দিন তাকে ক্যাম্প থেকে আনতে যায় এলাকার আব্দুল মেম্বার রাজাকার, দেতো তেল্লি, খরিকা মিস্ত্রিসহ কয়েকজন। তাঁরা গিয়ে ক্যাম্পের এক মেজরের সঙ্গে কথা বলেন। তখন মেজর তরুবালাকে ক্যাম্প থেকে বের করে তাঁদের হাতে তুলে দেন। তরুবালা ক্যাম্প থেকে বেরিয়েই তাঁদের কাছে স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের কথা জানতে চান, কিন্তু সকলেই নীরব থাকে। তারা তরুবালাকে তাঁর বাড়িতে না নিয়ে গিয়ে সরাসরি কুড়িগ্রাম মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি দিন সাতেক চিকিৎসাধীন থেকে বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু কেউই তাকে স্বামী নিশিকান্তর খবর দিতে পারছেন না।
বাড়ি ফিরেই তরুবালা আবার রাজাকারদের কাছে যান। তাদের হাতে-পায়ে ধরেন স্বামীর খোঁজ এনে দিতে। কিন্তু সকলেই বিমুখ করে। কেউ তাঁর স্বামীর কোন খবর দিতে পারে না। বরং তাঁকে জানায়, সেই রাতে কীভাবে পাকিস্তানী সেনারা ধরলার পাড়ে ব্রাশফায়ার করে বাঙালিদের নিধন করে মৃতদেহ নদীতে ফেলে দেয়া হয়। তাদের ধারণা, নিশিকান্তও হয়তো সেখানেই ব্রাশফায়ারের শিকার হয়েছে। তবু তরুবালা হাল ছাড়েন না। মেরে ফেললেও তো একটা খবর পাওয়া যাবে। মৃতদেহটা না হয় ধরলায় ভেসে গেছে। ঘরে চার ছেলেমেয়ে, শ্বশুরসহ ছয়জন মানুষ। কিন্তু খাবারের মতো কিছুই নেই। স্বামীর খোঁজ নেয়ার পাশাপাশি তরুবালাকে সেসময় মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিছু খাবারও জোগাড় করতে হয়েছে। যুদ্ধের বাজারে যে যেরকম পেরেছে সাহায্য-সহযোগিতাও করেছে।
অনেকেরে কাছে ঘোরাঘুরি করার পর একদিন তরুবালা খবর পান নিশিকান্ত পাকিস্তানী সেনাদের ক্যাম্পে আটক আছেন। এ খবরে যেন একটা আশার আলো দেখতে পান তরুবালা। তিনি আবার মানুষের কাছে গিয়ে ক্যাম্প থেকে নিশিকান্তকে বের করে আনেন। সেদিনের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তরুবালা জানান, ‘যেদিন তারে বাইরে আনল। তখন সে ছিল মরণের পথে। পাকিস্তানী সেনারা তারে মাইরা হাড্ডিগুড্ডি ভাংগা দিছে। চলতে পারে না। মাইরের চোটে তার বুকের হাড্ডিও ভাংগি যায়।’ স্বামীকে ক্যাম্প থেকে বের করে আনার পর তরুবালার জীবনে শুরু হল আরেক অধ্যায়। পরিবারের সব সদস্যের খাবার-দাবারের পাশাপাশি নিশিকান্তর চিকিৎসা করানো এবং তাঁকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্বও নিতে হয় তরুবালাকে।
দেশ স্বাধীন হলেও তরুবালার জীবন সংগ্রাম কিন্তু থামল না। বরং স্বাধীন দেশে এক নতুন বৈরি পরিবেশে তাকে পথ চলা শুরু করতে হল। দেশ স্বাধীন হবার পর প্রতিবেশীরা সবাই নিজ নিজ ভিটায় ফিরে আসল। তারা তরুবালাকে যে পাকিস্তানী সেনারা ক্যাম্পে নিয়ে আটকে রাখে এ ঘটনা জানতে পারেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তরুবালা বুঝতে পারেন, সমাজে তাঁর আরেকটি পরিচয় যুক্ত হয়েছে। যে পরিচয় তাঁর জন্য কোন মর্যাদা বয়ে আনেনি বরং পদে পদে তাকে অপমান আর লাঞ্ছনা সহ্য করতে হচ্ছে।
এর মধ্যেই তরুবালার অক্লান্ত চেষ্টায় নিশিকান্ত তাঁর এ শরীর নিয়েই বিছানায় প্রায় দুই বছর বেঁচে ছিলেন। তরুবালার আশা ছিল নিশিকান্ত যদি সুস্থ হতে পারে তবে হয়তো সে আবার কাজে ফিরতে পারবে। তাকে হয়তো আর মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতে হবে না, লাঞ্ছনাও সহ্য করতে হবে না। কিন্তু তরুবালার সব চেষ্টাকে জলাঞ্জলি দিয়ে যুদ্ধের দুই বছর পর মারা যান নিশিকান্ত। যুদ্ধের পরের বছরই মারা যান তার শ্বশুরও। স্বামী-শ্বশুর মারা যাবার পর ছয় ছেলেমেয়েকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন তরুবালা। সেই সাগরের কূল-কিনারা আজো পাননি তিনি।
তরুবালার তাঁর নিজের জন্ম কত সালে তা বলতে পারেননি। জন্ম হয়েছিল উলিপুর উপজেলার দুর্গাবাড়ি ডালিমের পাড় এলাকায়। বাবা বাবুরাম কর্মকার স্বর্ণের কাজ করতেন। মা সরোজিনি কর্মকার মারা যান খুব ছোটবেলায়। সাত ভাইবোনের মধ্যে তরুবালাই সবার ছোট।
তরুবালার চার মেয়ে ও দুই ছেলে। মেয়ে অর্চনা, কল্পনা, শুভদা ও কামনার বিয়ে দিয়েছেন। তারা স্বামীর বাড়িতেই ‘খেয়ে-পড়ে’ আছেন। বড় ছেলে জগদীশ বিয়ে করেছেন। তার দুই ছেলে। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার কারণে তিনিও এখন আর কাজ করতে পারেন না। পয়সার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। ছোট ছেলে কার্তিকেরও এক পায়ে সমস্যা আছে। কার্তিক আর তরুবালার আয়েই চলতে হয় সকলকে।
তথ্যসূত্র : ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তরুবালা কর্মকারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
লেখক : চন্দন সাহা রায়