করম আল শেখ এবং কিস্তি বেওয়ার দুই ছেলে এবং চার মেয়ের মাঝে নুরজাহান ছিলেন একজন। বাড়ি সিরাজগঞ্জের সয়াধানগড়া গ্রামে। ছোটবেলা থেকে বিয়ের পর অবধি এখানে আছেন। যুদ্ধের বেশ কয়েক বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী মকিজ উদ্দিন নিজের পানের দোকান দিয়ে সংসার চালাতেন। পান বিক্রি থেকে আসা আয়ের পাশাপাশি নুরজাহানের কাঁথা সেলাইয়ের কাজ থেকে যে আয় আসতো সব মিলিয়ে মোটামুটি সংসার চলে যেত তাদের। নুরজাহানের বাবা কানের ডাক্তার ছিলেন, কানের চিকিৎসা করতেন। তাঁর এক ভাইও এই কাজ করতেন, আরেকজন ব্র্যাক এনজিও তে কাজ করতেন। যুদ্ধের সময় নুরজাহানের একটা মেয়ে ছিল যার বয়স তখন দুই বছর। নুরজাহানের বাপের বাড়ি আর স্বামীর বাড়ি একই গ্রামে ছিল।
যুদ্ধের সময় নুরজাহান পরিবারসুদ্ধ নানা জায়গায় পালিয়ে থেকেছেন। কিছুদিন নানার বাড়িতে ছিলেন, একদিন হামকুরিয়া নামে এক জায়গাতে ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শহরে ফিরে আসেন। যুদ্ধের সময় নানাবাড়ি পালিয়ে যাওয়ার সময়ের ঘটনাই নুরজাহানের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। শহরে মিলিটারি আসলে পালিয়ে নানাবাড়ি জামুয়া যাচ্ছিলেন তাঁরা। নুরজাহান, তাঁর মা-বাবা, বোন-বোনের স্বামী আর কোলে মেয়ে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন তাঁরা। কোলে মেয়ে আর মাথার উপরে ৫ থেকে ৭ কেজি ওজনের চালের বস্তা থাকায় নুরজাহান সবার থেকে একটু পিছিয়ে পড়েছিলেন। এমন সময়ে এক মিলিটারি পেছন থেকে ডাক দেয়, ‘এই বেটি দাঁড়াও, কোথায় যাও?’। একথা বলে তাঁরা নুরজাহানের মাথা থেকে চালের বস্তা ফেলে দেয়, কোল থেকে মেয়েকে নিয়ে বস্তার উপর ফেলে রেখে চার পাঁচজন মিলিটারি নুরজাহানকে পাশেই একটি স্কুলঘরের পেছনে নিয়ে গিয়ে উপর্যুপরি নির্যাতন চালায়। এসময় ওই স্কুলঘরে একজন প্রসূতি মা আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর প্রসব বেদনা উঠেছিল। মিলিটারিরা ওই ঘরেও যায়। তবে তাঁকে নির্যাতন করে কিনা নুরজাহান জানতে পারেননি, কারণ ততক্ষণে নুরজাহান জ্ঞান হারান। নুরজাহান পিছিয়ে পড়াতে তাঁর বাবা-মা ফিরে এসে দেখেন নুরজাহানের মেয়ে বস্তার উপরে বসে কান্নাকাটি করছে। খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা নুরজাহানকে স্কুলঘরের ভেতর অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। নুরজাহানের বাবা তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নুরজাহানের হামকুরিয়াতে এক খালার বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে জামুয়াতে নুরজাহানের মায়ের এক মামাবাড়িতে যাওয়া হয়। নুরজাহানের এই নির্যাতনের ঘটনা তাঁর বাবা-মা আর স্বামী ছাড়া আর কেউ জানতোনা। যে বাড়িতেই যাক না কেন কাউকে কিছু জানতে দেয়নি নুরজাহানের বাবা-মা।
যুদ্ধের পর নুরজাহান বাবার বাড়িতে ফিরে এসে কিছুদিন থেকে তারপর স্বামীর বাড়িতে যান। নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে নাম দেয়ার পর নুরজাহানের স্বামী তাঁকে বলেন, ‘তুই তো নারী নির্যাতনের শিকার, তুই ভাল না’। একথা বলে তিনি নুরজাহানকে এক তালাক দেন। নুরজাহান বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। তাঁর স্বামী আরেকটা বিয়ে করেন। ১৭ বছর বাবার বাড়ি থাকার পর স্বামীর ২য় বৌ মারা গেলে গ্রামের লোকজন পরামর্শ দেয় নুরজাহানকে ঘরে তোলার জন্যে। স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, এরপর এক মেয়ের জন্ম হয়।শুরুতে নুরজাহানের মা-বাবা আর স্বামী এই ঘটনা জানত। কিন্তু পরবর্তীতে টিভিতে ছবি ও সাক্ষাৎকার প্রচারের পর সবাই জেনে যায়, নুরজাহান বীরাঙ্গনা। লোকে এখন তাকে নানান কথা বলে, গালি দেয়। নুরজাহানের এগুলো ভালো লাগে না। তিনি বলেন আগেই ভালো ছিলেন কেউ জানত না, সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে পারতেন। পুনর্বাসন কেন্দ্রে নাম আর টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার পরেই সব খারাপ হয়েছে। নুরজাহানের দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে তিনি একাই থাকেন। স্বামীর অন্য পক্ষে ৩ ছেলে আছে যারা তাঁর স্বামীর ভিটাতেই থাকেন। সতীনের ছেলেরা গালাগালি আর অত্যাচার করে। স্বামীর ভিটে-সম্পত্তির ভাগ দিতে চায়নি। গ্রামের মাতব্বররা বলে দিয়েছে একপাশ থেকে জমি দিতে যাতে সে ঘর করে থাকতে পারে। নুরজাহান তাঁর ভাইয়ের সাথেই থাকেন। সতীনের ছেলেরা তাঁর নামে মামলা পর্যন্ত করেছে। নুরজাহান কোনভাবে তাঁর দিনগুলি পার করছেন। কোনবেলা বড় ভাইয়ের ঘরে খেয়ে তো কোনবেলা ছোট ভাইয়ের ঘরে খেয়ে। ৫৫ বছর বয়সি নুরজাহানের শারীরিক অবস্থাও বিশেষ ভালোনা এখন। ঠিকমত হাঁটতে পারেন না, হাত পায়ের তালু জালা করে। দুঃখ করে বলেন বীরাঙ্গনা খেতাব দেয়াতে মানুষজন জেনে গিয়ে অনেক খারাপ হয়েছে, সমাজ থেকে তাকে পৃথক করে দিয়েছে এই খেতাব। এই খেতাব না নিয়ে যদি সমাজের সাথে মিসে থাকতে পারতেন সেটাই বেশি ভালো হত বলে তিনি মনে করেন। মানুষের কাছে, সমাজের কাছে একটু ভালো ব্যবহার পাওয়ারই আর্তি জানান নুরজাহান। তরুণ সমাজের চোখেও তিনি দেখেছেন যে তাকে খারাপ ভাবছে। লোকজন যে যখন আসে সাহায্য দেয়, চাদর-কম্বল-টাকা এগুলো পান। সরকারের কাছে খেয়ে পড়ে থাকার নিশ্চয়তা চান। মানুষের কাছে ভালো ব্যবহার চান তিনি। তিনিও সমাজের মানুষ।
লেখক : অনুপমা ইসলাম নিশো