সিরাজগঞ্জ জেলার কোগবদাস পাড়ার ছবিরনের মেয়ে রহিমা। বাবা চাঁন মিয়া ছিলেন এলাকার নামকরা জুয়ারি। রহিমারা ছিলেন চার বোন এক ভাই। বাবা যা আয় করতেন তা দিয়ে সবাই মিলে বেশ ভালভাবেই চলে যেত। তবে পড়ালেখাটা কখনোই শেখা হয়ে ওঠেনি তাঁর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার মাত্র কয়েক বছর আগে রহিমার বিয়ে হয় ঐ এলাকার রিয়াজ আলীর সাথে। রিয়াজ আলী ছিলেন একজন দোকানদার। তাঁর আয় তেমন বেশী ছিল না। তবে সেই আয়ে এক ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে রহিমার মোটামুটি চলে যেত। এরমধ্যে একদিন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, রহিমা ছোট মেয়েটিকে নিজেদের কাছে রেখে বড় মেয়ে আর ছেলেকে ভাইয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন । এদিকে রহিমার স্বামীকে দিনাজপুরে কাজে যেতে হবে। বড় ছেলে মেয়ে দুটোও মামা বাড়ি। কাজেই রহিমা ২/৩ বছরের মাসুম শিশুটি নিয়ে একাই সাহসে ভর করে বাড়ি সামলাতে লাগলেন।
দেখতে দেখতে দুই মাস পার হয়ে গেল, রহিমার স্বামী সেই যে দিনাজপুর গেছেন আর কোন খবর নাই। এদিকে রহিমার হাতে যা টাকা ছিল তাও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেল। আশেপাশের লোকজন সব পালিয়ে গেছে মিলিটারির ভয়ে । শুধু রহিমার বাড়ির কাছে আছে এক বুড়ো, রহিমা যাকে মামা বলে ডাকতেন। সেই বুড়ো বেশ অনেকদিন ধরে রহিমাকে এখান থেকে চলে যেতে বলছেন, রহিমাও বুঝতেন এভাবে একা থাকা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু হাতে টাকা না থাকায় মেয়েকে নিয়ে তিনি কোথাও যেতেও পারছিলেন না। এদিকে একদিন হঠাৎ প্রচণ্ড গুলির শব্দ হল চারদিকে। ভীষণ ভয় পেয়ে পাশের একটি জঙ্গলে মেয়েকে নিয়ে লুকিয়ে থাকল রহিমা। পরদিন গোলাগুলির খবর শুনে রহিমার ভাই আসলেন তাঁদের নিতে। ভাইয়ের সাথে রহিমা গেল আমিলপুর গ্রামে তাঁর এক মামার কাছে, তিনি ছিলেন মোটামুটি ধনী। কিন্তু এই বিপদের সময় তিনি রহিমাকে কোন সাহায্য করেননি যা তিনি করতে পারতেন। তিনি রহিমাকে রাখেন এক গরীব পরিবারের সাথে। কিন্তু অনাত্মীয় এই গরীব পরিবার সেই দুঃখের দিনে রহিমার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল। বীরাঙ্গনা রহিমার ভাষায় ’সেই মানুষই আমারে দুধ-ডাল, ভাত খাওয়াইছে, এক মাস আমি ছিলাম ওখানে তারপর আমার ভাই আমারে আবার আমার স্বামীর বাড়ী রেখে যায়।’
স্বামী কিন্তু তখন পর্যন্ত ফেরেনি। জৈষ্ঠ্য মাস বেলা ৩টা হবে। রহিমা মেয়েকে নিয়ে ঘরের মধ্যে ছিলেন। হঠাৎ ২ জন মিলিটারী ঢুকে বাড়িতে, এর মধ্যে একজন দরজায় দাঁড়ায় আর একজন ঘরে ঢুকে শিশু সন্তানের সামনেই নির্যাতন চালায় রহিমার উপর। রহিমার কোন অনুনয় বিনয়েই ভ্রুক্ষেপ করে না এই মানুষরুপী পশুগুলো। রহিমার মা বাবা নেই, স্বামী থেকেও নেই তার উপর এত অপমান, রহিমা পাকসেনাদের অনুরোধ করে তাঁকে গুলি করে মেরে যেতে। তাই শুনে ধূর্ত পাকসেনারা তাঁকে খারাপ প্রস্তাব দেয়, বলে তাদের সাথে ক্যাম্পে যেতে, সেখানে রহিমা চাল, ডাল আটা পাবে, দুবেলা খেতে পারবে। রহিমা বুঝতে পারে এই মানুষরুপী পশুগুলো আসলে তাঁর সাথে কি করতে চাইছে। রহিমা তখন তাদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন আর তাদের অনুরোধ করে তারা যেন তাঁকে এখানেই রেখে চলে যায়। মিলিটারিরা চলে গেলে সেই বুড়ো মামা এসে রহিমাকে তোলে। কিন্তু এরপর রহিমা এই স্বামীর বাড়িতেই থেকে যান। পরে রহিমা শুনেছেন একই সময় মিলিটারি ক্যাম্প থেকে মিলিটারীরা ২/৩ জন করে এক একটা বাসায় ঢুকে মেয়েদের নির্যাতন করেছে।
৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা বলতে গেলে রহিমা একাই কাটিয়েছেন। যুদ্ধের শুরুতেই স্বামী কাজে চলে গেছে দিনাজপুরে, দেশ স্বাধীনের আগে না সে নিজে এসেছে না অর্থ পাঠিয়েছে। একে খাওয়া-পরার যুদ্ধ, তার উপরে পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন সবটাই বীরের মতই একাই সয়েছেন তিনি। শুধু কি একটি স্বাধীন দেশের জন্মযন্ত্রণা সয়েছেন তিনি? দেশ স্বাধীনের পর যখন স্বামী ফিরে এলো তখন সেই স্বামী তাঁর চোখের জল না মুছে তাঁকে আরো আঘাত দিয়েছে। স্ত্রীর উপর মিলিটারীরা হামলা করেছিল এটা জানতে পেরে রিয়াজ আলী স্ত্রীর পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো স্ত্রীর কাছেই ঘেষেনি, তিনি গ্রামে ফিরে অন্য বাড়িতে ওঠেন, এমনকি তিনি তাঁকে কোন ভরণপোষণও দেননি। এরূপ অবস্থায় রহিমা পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হন, সেখানেই তিনি দর্জীর কাজ করতেন-জামা, প্যান্ট, পেটিকোট বানাতেন। রাতেও সেখানেই থাকতেন। রহিমার স্বামী একবার পূর্নবাসন কেন্দ্রে এসেছিল তবে সেটাও রহিমাকে মারবার জন্য, কেন্দ্রের পাহারাদার তখন বাধ্য হয় তাকে বের করে দিতে। এই ঘটনার বছর দুই পরে রহিমার স্বামী রহিমাকে ফেরত নেয়ার জন্য লোক পাঠান, কিন্তু রহিমা ভেবে দেখলেন যেই স্বামী আগেই তাঁকে দেখে নাই, সে এখনতো আরো দেখবেনা, অন্যরাও নিষেধ করল এরকম অমানুষ স্বামীর কাছে ফেরত যেতে। রহিমাও তাই পুনর্বাসন কেন্দ্রেই রয়ে গেলেন। এর মধ্যে মারা গেলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বন্ধ হয়ে গেল পুনর্বাসন কেন্দ্র। রহিমার স্বামীও আর জীবিত নেই। রহিমা তখন একমাত্র মাথা গোজার ঠাঁই হারিয়ে বাসা-বাড়িতে ঝি-এর কাজ শুরু করল। কিন্তু চেহারা সুন্দর হওয়ার কারণে কোন বাড়ির মানুষ রহিমাকে কাজ দিতে চাইত না। বলত এত সুন্দর মেয়েকে কাজ দিলে সমস্যা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে একটা কাজ জোগাড় হয়ে গেল, তাই দিয়ে খেয়ে পরে চলত।
বর্তমানে বীরাঙ্গনা রহিমার বয়স প্রায় ৬৫/৭০ বছর, শরীর ভাল না থাকায় ঠিকমত হাঁটতে পারেন না। হাত পায়ের গিরায় ব্যথা। কাজও করতে পারেন না। তাঁর বিধবা মেয়ে আর নাতির সাথে থাকেন। মেয়ে টি.এন.টি. অফিসে ১৫০০ টাকা বেতনের একটা চাকুরী করে তা দিয়ে তিনজনের থাকা খাওয়া আর লেখাপড়া খরচ চালাতে হয়। মাঝে মাঝে সাফিনা লোহানী কিছু সাহায্য এনে দেন তাই দিয়ে কোন রকমে চলে। টাকার অভাবে ওষুধ খেতে পারেন না ঠিকমত। তাই রহিমা বেগম মনে করেন বীরাঙ্গনা খেতাব পাওয়াতে তাঁদের জন্য ভাল হয়েছে। খেতাবটার জন্য তাও কিছু কিছু সাহায্য সহযোগিতা তিনি পান। একবার ৭০০০ টাকা পেয়েছেন, একবার কম্বল পেয়েছেন। সাফিনা লোহানী মাঝে মাঝে কিছু সাহায্য দিচ্ছে। মাস পাঁচেক আগে সিরাজ সাহেব ৫০০০ টাকা দিয়েছেন। তাই দিয়েই এতোদিন চলেছে। বীরাঙ্গনা খেতাব পাওয়ার পর সমাজের অনেক লোক অনেক রকমের খারাপ মন্তব্য করে এমনকি কেউ কেউ এমনও কথা বলে যে রহিমা যে টাকা পায় তা হল পতিতাবৃত্তির টাকা। এসব নোংরা কথা শুনলে খুব কষ্ট হয় রহিমার তবুও চুপচাপ এদের থেকে দূরে সরে আসেন তিনি। রহিমা ঠেকে শিখেছেন, কথা শোনাবার মানুষ অনেক আছে পৃথিবীতে কিন্তু সাহায্যের বেলায় কেউ আসে না। আজ যেটুকু সাহায্য তিনি পান তা খেতাবের জন্যই পান। যদিও সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তবে মাঝে একটা গরু পেয়েছিলেন, যেটা অনেক কাজে দিয়েছে। বীরাঙ্গনা রহিমা যুদ্ধ করেছেন একা, যুদ্ধ করেছেন ৯টা মাস সন্তানের জন্য, যুদ্ধ করেছেন তাঁর মনের জোরে, সম্মুখ যুদ্ধে পাক মিলিটারির পাশবিক লালসার শিকার হয়েছেন কিন্তু পরাজয় মানেননি তিনি, লড়েছেন সেই হিংস্রতার সাথে, লড়েছেন সমাজের সাথে এবং এখনো লড়ছেন। এতবড় ত্যাগ যাঁর দেশের জন্য সেই বীর নারী কি চায় সরকার আর দেশবাসীর কাছে? থাকার জন্য একটা ঘর আর খেয়ে পরে বাঁচার জন্য একটু সাহায্য! দেশের মানুষের কাছে সামান্য একটু ভাল ব্যবহার, যেটা মানুষ হিসেবে প্রত্যেকটা মানুষেরই পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আর স্বপ্ন দেখেন যদি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁদের ও নাম থাকত! যুদ্ধটাতো করেছেন উনারাই আর তার বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই প্রিয় স্বদেশ। তাই নয়কি?
লেখক : সুমনা মঞ্জুর